প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
আধুনিকায়নের অন্তর্জালে দেশ ধাবিত হচ্ছে সংস্কার ও পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাঠামো অনুসরণে। কিন্তু এই উন্নতির পিছনে গভীর সংকট তৈরি করছে নারী নিরাপত্তা। নিরাপত্তাহীনতায় চাদরে যখন ডেকে গেছে, তখন অসংখ্য নারী বন্দিবেতর জীবনযাপন করছে সমাজ তথা দেশে। এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দেখছে একের পর এক নারী নির্যাতনসহ অনেক রক্তাক্ত ঘটনার চিত্র। পত্রিকার পাতা উল্টালে অথবা টেলিভিশনের সুইচ অন করলেই দেখা যাচ্ছে লাশের মিছিল। দেখা যাচ্ছে গুম, খুন, অপহরণ, আটক বাণিজ্য, ক্যাম্পাস দখল, মুক্তিপণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত সব ফিরিস্তি। দেশের যেকোনো সময়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন সীমা অতিক্রম করেছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।
নারী মানবসমাজের প্রাণশক্তি।একটি ভয়হীন ও সুরক্ষিত পরিবেশেই নারী তার মেধা, মনন ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। নিরাপদ সমাজ পেলে নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারেন, যা একটি শক্তিশালী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। নিরাপত্তাহীনতার অভাবে ভুগছে অধিকাংশ নারী। বাড়ি থেকে বের হতে না হতেই পুরুষরূপী হিংস্র জানায়ারোর কিংবা হায়েনাদের লোভাতুর বা আক্রমণাত্নক বা হিংস্র দৃষ্টি গ্রাস করছে। নারীরা প্রতিনিয়ত কটূক্তি ও নানা নোংরা কুপ্রস্তাবের শিকার হচ্ছে। কখনও কখনও নিজের স্বামী, মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, আবার কখনও কখনও নিজের সহকর্মী, নিজের বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী দ্বারা। অশালীন মন্তব্য, শরীর স্পর্শ, শিস দেওয়া, যৌতুক, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, ভয়াবহ নিপীড়ন, ধর্ষণ, পিছু নেওয়া, রাগের ক্ষোভে শরীর দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা, হায়েনাদের ভোগের পণ্য হওয়া, এই যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনায় বেশির ভাগই নির্যাতনের শিকার হয়েছে কন্যাশিশুরা। সালজুড়ে নানা বয়স ও শ্রেণির ভুক্তভোগীদের নিয়ে সংঘটিত একাধিক ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এসব ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বছরজুড়ে আলোচিত এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, যৌন সহিংসতা এখনও দেশের একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদায়ী বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৫৩টি। আর ২০২৪ সালে এটি ছিল ৩৪৫টি। ২০২৫ সালে দলগত ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ১৭১টি আর ২০২৪ সালে ছিল ১৪২টি। ২০২৫ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৯ জনকে আর ২০২৪ সালে ২৩ জনকে। ২০২৫ সালে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ১৮১ জনকে আর ২০২৪ সালে ৯৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত যেখানে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন ৩৫ জন নারী ২০২৪ সালে তা ছিল ২৫ জন। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ২০ হাজার ৬৯১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ৪৪০টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৪৩০টি, মার্চে দুই হাজার ৫৪টি, এপ্রিলে দুই হাজার ৮৯টি, মে মাসে দুই হাজার ৮৭টি, জুনে এক হাজার ৯৩৩টি, জুলাইয়ে দুই হাজার ৯৭টি, আগস্টে ১ হাজার ৯০৪টি, সেপ্টেম্বরে এক হাজার ৯২৮টি, অক্টোবরে এক হাজার ৯৮৫টি ও নভেম্বরে এক হাজার ৭৪৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের ১১ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় চার হাজার ৩২৫টি মামলা বেশি হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ইভটিজিংসহ নানা কারণে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন ফোন পেয়েছে ২৬ হাজার ৩১৭টি। এর মধ্যে স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে ৯৯৯-এ ফোন এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি। যেখানে গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ৯৯৯ মোট ফোন কল পেয়েছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের বিষয়ে ফোন ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীরা প্রিয় মানুষের কাছেও যে অনিরাপদ, সেই তথ্যই উঠে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২৭টি, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি থেকে বেড়েছে ৭৬টি। স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫৫টি। তা বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে চালানো সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণ, ২টি যৌন হেনস্তা এবং ৬টি কন্যাবিবাহ ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনটিতে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৩১টি, যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। ধর্ষণের ৩৫টি ঘটনা এবং যৌন হেনস্তার ২টি ঘটনা নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি, যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা ছয়টি এবং গৃহকর্মী নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা ১টি। ১৮৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে প্রতিবাদ মিছিল করেন নারী শ্রমিকরা। সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, আট ঘণ্টার মধ্যে শ্রম সময় নির্দিষ্ট করা এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। তাদের এই প্রতিবাদ মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারের পুলিশ বাহিনী। চলে দমন ও নিপীড়ন। শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করার দাবি শেষ পর্যন্ত আদায় হয়। তবে নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষম্য চলতেই থাকে। সে সময় থেকেই মানবমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নারী মুক্তির আন্দোলন। ১৯০৯ সালে নিউ ইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্রেট নারী সংগঠনের আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নারী নেতা ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়।১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হতে থাকে।
নারী মুক্তির পথে মিশে আছে বহু মানুষের আত্মদান। নারীর ভোটাধিকারের জন্য ইউরোপে স্যাফ্রোজেটদের আন্দোলন, রুশ বিপ্লব, চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সবকিছুই নারী মুক্তির ধারাকে বেগবান করেছে। ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন বোভেয়ার, বেটি ফ্রিডানসহ মানবাধিকার লেখকরা নারীর পরাধীনতার স্বরূপ উদঘাটন করে, সভ্য সমাজের চিন্তাজগতে নিয়ে এসেছে বিপ্লব। ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন কম হয়নি। কখনো ধর্মের নামে, কখনো সামাজিক প্রথার নামে তার কণ্ঠকে রুদ্ধ করা হয়েছে বারবার। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নারী যে ভূখণ্ডে ছিলেন সেখানেই পরবর্তীকালে নারীর বিদ্যাশিক্ষা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এদেশে গৌরীদান ও রোহিনীদানের নামে বাল্যবিবাহের যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছে নারীকে। সতীদাহের নামে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিধবার ওপর সহস্র নিয়মকানুনের বোঝা চাপিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তিলে তিলে। পর্দা প্রথার নামে নারীর ওপর কি ভয়াবহ নিষ্পেষণ চলেছে তা বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ বইয়ের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়েছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সরলা ঘোষাল, নবাব ফয়জুননেসা, বেগম রোকেয়ার মতো মহামানবদের প্রচেষ্টায় এদেশের নারীর জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়েছে জীবনের পথ। পরবর্তী সময় বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালের মতো নারীরা এগিয়ে এসেছেন নির্যাতনের ঘেরাটোপ থেকে নারীকে বাঁচাতে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হওয়ার পর একশ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনও কি সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? কোথায় নারী নিরাপদ? বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কায়দায় তার ওপর চলছে নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্য। জন্ম নেওয়ার আগে ভ্রুণ অবস্থাতে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। জন্মের পর অবহেলা করা হচ্ছে। অপুষ্টির শিকার হতে হচ্ছে তাকে, হতে হচ্ছে নানা রকম বৈষম্যের শিকার।
মুহিবুল হাসান রাফি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ