প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
‘শিক্ষা’, এই শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বই, খাতা, পরীক্ষা, রেজাল্ট আর সেই বহুল প্রচলিত তিনটি অক্ষর, জিপিএ। যেন শিক্ষা বলতে এখন আর কিছু নেই, শুধু একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মানুষের মেধা, যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ। আমাদের সমাজে আজ এমন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, সৃজনশীলতা বা দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তার জিপিএ। এই সংখ্যার দৌড়ে ছুটতে ছুটতে আমরা হয়তো অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি সেই বাস্তব জ্ঞান, যা মানুষকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করে তোলে।
একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক, সচেতন, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। কিন্তু এখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য যেন হয়ে গেছে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই একটি শিশুকে শেখানো হয়, ‘ভালো রেজাল্ট করতে হবে।’ কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তাকে বলা হয়, ‘ভালো মানুষ হতে হবে, কিছু শিখতে হবে, বুঝতে হবে।’ ফলে শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে সবাই দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ ঠিক জানে না গন্তব্য কোথায়। জিপিএর এই দৌড়ের শুরু হয় খুব ছোট বয়স থেকেই। ক্লাসের প্রথম হওয়া, বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল করা; এসব যেন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজ- সবাই মিলে একটি চাপ তৈরি করে, যেখানে নম্বরই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু ৫.০০ পায়, তাহলেই সে মেধাবী; আর যদি একটু কম পায়, তাহলে সে সাধারণ বা ব্যর্থ। এই ধারণা ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে এমনভাবে ঢুকে যায় যে তারা নিজেরাও নিজেদের মূল্যায়ন করতে শুরু করে শুধুমাত্র একটি সংখ্যার মাধ্যমে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জিপিএ কি সত্যিই একজন মানুষের জ্ঞান বা দক্ষতার সঠিক মাপকাঠি? একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় দেওয়া কিছু লিখিত উত্তরের ভিত্তিতে কি একজন মানুষের পুরো বছরের শেখা, তার বোঝাপড়া, তার চিন্তাশক্তি সবকিছু বিচার করা সম্ভব? বাস্তবতা হলো, সম্ভব নয়। কারণ বাস্তব জ্ঞান শুধু বই পড়ে অর্জন করা যায় না; এটি আসে অভিজ্ঞতা থেকে, প্রশ্ন করার সাহস থেকে, ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা থেকে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থ করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা বইয়ের লাইন মুখস্থ করে, গাইড বইয়ের উত্তর পড়ে, কোচিং সেন্টারের সাজানো প্রশ্ন-উত্তর শিখে। তারা জানে কি লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা খুব কমই জানে, কেন সেই উত্তরটি সঠিক, বা এর বাস্তব প্রয়োগ কী। ফলে পরীক্ষার পর সেই জ্ঞান খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। যাকে আমরা বলি ‘ঊীধস-ড়ৎরবহঃবফ ষবধৎহরহম।’ এই শেখার পদ্ধতিতে জ্ঞান স্থায়ী হয় না, বরং এটি একটি সাময়িক প্রস্তুতি, যা শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। এই পরিস্থিতির একটি বড় প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার উপর। যখন একজন শিক্ষার্থী জানে যে পরীক্ষায় নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন আসবে এবং নির্দিষ্ট কিছু উত্তর লিখলেই ভালো নম্বর পাওয়া যাবে, তখন সে নতুন করে ভাবার, ভিন্নভাবে চিন্তা করার বা নিজস্ব মত প্রকাশ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘ঠিকভাবে লিখতে পারলাম কিনা’, ‘স্যারের নোটের সঙ্গে মিলল কি না।’ ফলে ধীরে ধীরে তার সৃজনশীলতা সংকুচিত হয়ে আসে, এবং সে হয়ে ওঠে একটি মেশিন, যে শুধু ইনপুট নেয় এবং আউটপুট দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জিপিএ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো গণিতে বা বিজ্ঞানে চমৎকার ফল করছে, কিন্তু সে যদি বাস্তব জীবনে একটি সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে সেই ফলাফলের মূল্য কতটুকু? ধরা যাক একজন শিক্ষার্থী ব্যবসা বিষয়ে উচ্চ জিপিএ পেয়েছে, কিন্তু সে যদি একটি সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষার কার্যকারিতা কোথায়? বাস্তব জীবন শুধু তত্ত্ব দিয়ে চলে না; এখানে প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা; যেগুলো এচঅ দিয়ে মাপা যায় না। এই সমস্যার পেছনে শুধু অভিভাবকরা নন, আমাদের পুরো সমাজই দায়ী। আমরা নিজেরাই এমন একটি মানসিকতা তৈরি করেছি, যেখানে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা হয় তার রেজাল্ট দিয়ে।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়