প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্রটি যেন একটি ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের ‘রেকর্ড পরিমাণ’ মজুত রয়েছে। অন্যদিকে, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে জ্বালানির অভাবে স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে চরম ভোগান্তি- সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রশ্ন জাগে, যদি সরকারের কাছে পর্যাপ্ত মজুত থেকেই থাকে, তবে প্রান্তিক পর্যায়ে এই হাহাকার কেন? এই সংকট কি শুধু সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি, নাকি এর পেছনে গভীরতর কোনো অর্থনৈতিক বা নীতিগত সংকট লুকিয়ে আছে?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ ডিজেল, ফার্নেস অয়েল বা অকটেন মজুত আছে, তা দিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের চাহিদা অনায়াসেই মেটানো সম্ভব। কিন্তু এই ‘কাগজে-কলমে’ থাকা মজুত যখন পাম্পে পৌঁছায় না, তখন সাধারণ মানুষের কাছে সেই তথ্যের কোনো মূল্য থাকে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হিসাবে যে মজুতের কথা বলা হয়, তার বড় একটা অংশ হয়তো পাইপলাইনে বা আমদানির অপেক্ষায় থাকা জাহাজে থাকে। আবার অনেক সময় কারিগরি কারণে মজুত তেলের একটি অংশ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকে না। ফলে খাতাণ্ডকলমে বড় সংখ্যা দেখালেও বাজারে তার প্রতিফলন ঘটে না। জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে বর্তমানের তীব্র ডলার সংকট।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক ব্যাংকই এখন নতুন করে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে অনীহা প্রকাশ করছে। আবার পুরোনো ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকায় বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল খালাসে দেরি করছে। ফলে মজুত থাকার ঘোষণা দিলেও ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারার আশঙ্কায় সরকার হয়তো রেশনিং বা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের পথে হাঁটছে। এই অনিশ্চয়তা বাজারকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ বেসরকারি ডিলার এবং পাম্প মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। যখনই বাজারে ঘাটতির গুঞ্জন ওঠে, তখনই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটতে তৎপর হয়ে ওঠে। পাম্পগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে মজুতদারির মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ নতুন নয়। তদারকি সংস্থাগুলোর শৈথিল্য এই সুযোগকে আরও অবারিত করে দেয়। সরবরাহ শিকলে (Supply Chain) কোথায় তেল আটকে আছে, তা বের করে কঠোর ব্যবস্থা না নিতে পারলে শুধু মজুতের বুলি আউড়ে সাধারণ মানুষকে শান্ত রাখা সম্ভব নয়। জ্বালানি তেলের এই সংকট কেবল যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং বর্তমানে সেচ মৌসুম বা কৃষি কাজের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তেলের অভাবে কৃষকরা দিশেহারা।
ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকলে সরাসরি এর প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। অন্যদিকে, দেশের শিল্প কারখানাগুলোও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে ধুঁকছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকটের এই চেইন রিঅ্যাকশন শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
জ্বালানি খাতের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্যের স্বচ্ছতা থাকা অপরিহার্য। যদি সংকটের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, তবে তা লুকোচুরি না করে স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। মজুত যদি সত্যিই রেকর্ড পরিমাণ হয়ে থাকে, তবে কেন তা বাজারে মিলছে না- তার সঠিক ব্যাখ্যা বিপিসি বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে।
তবে এই সংকট থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের যোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি বা দুটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি আমদানির বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে যাতে কেউ তেল মজুত করতে না পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে, যাতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি প্রভাব না ফেলে।
জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এই প্রাণের স্পন্দন যদি থমকে যায়, তবে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাই স্থবির হয়ে পড়ে। সরকারি তথ্যের ‘রেকর্ড মজুত’ এবং বাস্তবতার ‘হাহাকার’- এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান ঘুচিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। সরকারকে বুঝতে হবে, শুধু গালভরা পরিসংখ্যান দিয়ে জনরোষ কমানো সম্ভব নয়; বরং পাম্পে তেলের সহজলভ্যতা এবং স্থিতিশীল বাজারই সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগ এবং সঠিক তদারকির মাধ্যমেই এই জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।