প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য কমিয়ে আনা। কয়েক দশক ধরে ডলার বিশ্ব বাণিজ্যের ‘রিজার্ভ কারেন্সি’ হিসেবে রাজত্ব করলেও সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন এই অবস্থানে ফাটল ধরাতে শুরু করেছে।
আপনার কলামের জন্য এই বিষয়টি নিয়ে একটি বিস্তারিত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তির মাধ্যমে ডলার বৈশ্বিক মুদ্রার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। তবে বর্তমানে দেশগুলো ডলার বর্জন করতে চাওয়ার পেছনে প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে-
নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তাদের ডলার রিজার্ভ আটকে দেয়, তখন অনেক দেশ (যেমন- চীন, ভারত, ব্রাজিল) চিন্তিত হয়ে পড়ে যে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গেও এমনটা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের চাপ : মার্কিন অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিলে বা ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালে সারাবিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়ে। এই পরনির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প খুঁজছে দেশগুলো।
বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম : সুইফট (SWIFT)-এর বিকল্প হিসেবে চীন (CIPS) এবং রাশিয়া (SPFS) নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। ব্রিকস (BRICS) এই জোটের দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নতুন সদস্যরা) নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু করেছে। এমনকি তারা ‘ব্রিকস কারেন্সি’ আনার চিন্তাও করছে। পেট্রো-ডলারের পতন সৌদি আরব এখন চীনের কাছে তেল বিক্রির ক্ষেত্রে ডলারের বদলে ইউয়ান (Yuan) গ্রহণ করার কথা ভাবছে। তেলের বাজারে ডলারের একচ্ছত্র অধিকার হারানো হবে বড় একটি ধাক্কা। ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা আনবে, তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে ডলারের মধ্যস্থতা আর প্রয়োজন হবে না। পুরোপুরি ডলার বর্জন করা এত দ্রুত সম্ভব নয়। এর পেছনে কিছু শক্ত কারণ আছে-
ডলারের ওপর বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের যে আস্থা আছে, তা ইউয়ান বা রুবলের ওপর নেই। বিশ্বের প্রায় ৮০% আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখনও ডলারে হয়। এই বিশাল কাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা কঠিন। ইউরো বা ইউয়ানের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে; কোনোটিই এখনও ডলারের মতো সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ডলারের সংকট একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। বিকল্প হিসেবে ভারত বা চীনের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় (রুপি বা ইউয়ান) সীমিত আকারে বাণিজ্য শুরু করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ সমাধান নয়। ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়া পূর্ণতা পেলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বেশ কিছু দৃশ্যমান প্রভাব পড়বে। এখন অনেক দেশ নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন শুরু করেছে। যেমন- ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপিতে বাণিজ্য করছে, আবার চীন ও ব্রাজিল ইউয়ানে লেনদেনের চুক্তি করেছে। এর ফলে মাঝখান থেকে ডলার কেনাবেচার বাড়তি খরচ এবং বিনিময় হারের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে।
ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সিংহভাগ রিজার্ভ ডলারে রাখত। বর্তমানে এই প্রবণতা কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সোনা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিশালী মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে। এটি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের ক্রয়ক্ষমতাকে দুর্বল করবে। বিশ্ব বাণিজ্য এখন ধীরে ধীরে দ্বি-মেরু বা বহু-মেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। একদিকে থাকবে ডলারনির্ভর পশ্চিমা বিশ্ব, অন্যদিকে ব্রিকস (BRICS) প্লাস জোটের মতো উদীয়মান দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা। এটি বিশ্বকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও বিভক্ত করে দিতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন দুইধারী তলোয়ারের মতো। একদিকে ডলারের দাম বাড়লে যে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি হয়, তা থেকে বাঁচার জন্য স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য একটি বড় সুযোগ।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ইউয়ান বা রুপির মতো মুদ্রাগুলো এখনও ডলারের মতো সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠেনি। ফলে একাধিক মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনা করা এবং সেগুলোর মানের স্থায়িত্ব রক্ষা করা একটি বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ।
ডলারের পতন হয়তো রাতারাতি ঘটবে না। কারণ বিশ্বের বিশাল ঋণের বাজার এবং তেলের বাণিজ্য এখনও অনেকাংশে ডলারের ওপর দাঁড়িয়ে। তবে পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। আগামীর পৃথিবী সম্ভবত একক কোনো মুদ্রার শাসনে থাকবে না, বরং সেখানে থাকবে বিভিন্ন মুদ্রার সহাবস্থান। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে যে দেশগুলো যত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, ২১ শতকের ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে তারাই তত বেশি এগিয়ে থাকবে।
জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়