ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মানবজীবনে পরিমিত হাসির গুরুত্ব

নাজিয়াত আক্তার
মানবজীবনে পরিমিত হাসির গুরুত্ব

মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত একটি প্রকাশভঙ্গির মধ্যে অন্যতম হাসি, কিন্তু এর উপকারিতা অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। শুধু ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাও প্রমাণ করে যে হাসি শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

মানুষের জীবন নানা দুঃখ-কষ্ট, চাপ ও উদ্বেগে পূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে হাসি এমন একটি সহজ ও কার্যকর উপায়, যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। হাসি শুধু আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী থেরাপি হিসেবেও কাজ করে। হযরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতে তোমার হাসিমুখ একটি সদকা বা দান।’ (জামে তিরমিযি: ১৯৫৬)। অর্থাৎ, হাসি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে। উত্তম চরিত্র গঠনে হাসি আর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূল (সা.) নিজেও বেশি হাসতেন না, কিন্তু তিনি সর্বদা মুচকি হাসতেন। এটি আমাদের শেখায় যে, পরিমিত হাসি মানুষের ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে এবং সমাজে সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে।

কখনো কখনও হাসি মানুষের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। যখন একজন মানুষ হাসে, তখন তার মন থেকে দুঃখ, হিংসা, রাগ ইত্যাদি নেতিবাচক অনুভূতি কমে যায়। ফলে সে তার রবের প্রতি আরও কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসা তৈরির পথকে শক্তিশালী করে। একটি হাসি মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পারে এবং সম্পর্ক উন্নত করে। সহজাত হাসি একজন বিনয়ী মানুষের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয় যা কঠোর ও গম্ভীরতাপূর্ণ মানুষের মধ্যে থেকে তাকে আলাদাভাবে পরিচিতি দেয়।

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে হাসি মানুষের শরীর ও মনের ওপর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। হাসি শরীরের স্ট্রেস হরমোন যেমন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন কমিয়ে দেয়। যখন আমরা হাসি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে আনন্দ অনুভব করায়। ফলে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হাসার সময় রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়, ফলে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। শরীরে অ্যান্টিবডি উৎপাদন বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে শরীর সহজে অসুস্থ হয় না। হাসি একটি প্রাকৃতিক পেইনকিলার হিসেবে কাজ করে। এন্ডোরফিন নিঃসরণের কারণে শরীরের ব্যথা সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এজন্য অনেক হাসপাতালে ‘লাফটার থেরাপি’ ব্যবহার করা হয়। হাসি মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়, ফলে চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়। এটি সৃজনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করে। হাসার সময় শরীরের বিভিন্ন পেশি সক্রিয় হয় এবং পরে শিথিল হয়। এতে শরীরের ক্লান্তি দূর হয় এবং আরাম অনুভূত হয়।

বিজ্ঞান বলছে, যারা বেশি হাসে তারা সহজেই অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। হাসি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব তৈরি করে। হাসি বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি মনকে ইতিবাচক চিন্তায় অভ্যস্ত করে তোলে।

হাসিখুশি ব্যক্তিরা, সাধারণত আত্মবিশ্বাসী হয়। হাসি মানুষের ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণীয় করে তোলে। হাসি জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। এতে মানুষ সমস্যাকে সহজভাবে নিতে শেখে। যারা কর্মক্ষেত্রে হাসিখুশি থাকে, তারা সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এবং কাজের পরিবেশও আনন্দময় হয়। পরিবারে হাসি-আনন্দ থাকলে পারিবারিক দ্বন্দ্ব কম হয়। অবার অতিরিক্ত হাসি কখনও কখনও অসম্মানজনক হতে পারে। অন্যকে উপহাস করে হাসা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারেও বলা হয়েছে, তোমরা অধিক হেসো না। কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মৃত (নিস্তেজ) করে দেয়।’

ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রমাণিত যে হাসি মানুষের জীবনে অপরিহার্য একটি উপাদান। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিনের জীবনে হাসিকে একটি অভ্যাসে পরিণত করা। তবে অবশ্যই তা হতে হবে পরিমিত, শালীন ও আন্তরিক। একটি সুন্দর হাসি নিজের জীবন যেমন আনন্দময় করে, তেমনি অন্যের জীবনেও সুখের আলো ছড়িয়ে দেয়।

নাজিয়াত আক্তার

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ফিচার, কলাম অ্যান্ড কনটেন্ট রাইটাস

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত