প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত প্রধান চালিকাশক্তি, যা জিডিপিতে প্রায় ১১-১২ শতাংশ অবদান রাখে এবং দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ধান, আলু ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
অথচ দেশের সব অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় কৃষকদের। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা ফসল উৎপাদন করে তারা কখনও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। আর দেশে যদি অর্থনৈতিক মন্দ দেখা দেয় তাহলে তো কথাই নেই। চলতি বছরও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যদিও যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, তবুও তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুণতে হচ্ছে কড়া মাশুল। এরইমধ্যে সব জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তদের কপালে চিন্তার ভাজ, এর সঙ্গে যাদের কথা সমাজে উপেক্ষিত থেকে যায় তারা হলো কৃষক শ্রেণি।
জ্বালানি তেল সরবরাহের ঘাটতির কারণে বোরোধান চাষ, আম, তরমুজসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল ও ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, সারের দাম বেশি এবং পানির স্তর নেমে যাওয়ায় খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পর তেলসংকট যেন চাষিদের মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মতো অবস্থা হয়েছে। কারণ তেলের সংকটের ফলে সেচ প্রদান ও সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এরইমধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ইউরিয়া সার উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে ।
সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়, আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ভরা মৌসুমে চাষিরা আম পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকার কথা, তারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকছেন তেলের লাইনে। পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তরমুজ কাটার পরও বাজারজাত করতে পারছেন না কৃষকরা। বোরোধান চাষিরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না, ১২-১৩ লিটার তেলের চাহিদার বিপরীতে কৃষকরা পাচ্ছে ২-৩ লিটার তেল। জ্বালানি তেলের তীব্রসংকট ও ট্রলারের অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির কারণে চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষকদের যেখানে তার ফাসলের পরিচর্যা করার কথা ছিল, সেখানে কৃষকরা তেলের জন্য দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘলাইনে, দুঃশ্চিন্তা করতে হচ্ছে জমিতে সেচ ও সার দেওয়া নিয়ে আর যদি কষ্ট করে ফসল উৎপাদনও করতে পারে তাহলে তখন গুণতে হয় বাড়তি পরিবহন ব্যয়।
শিল্পায়নের পর থেকে নানা সমস্যার কারণে কৃষি কাজ ছাড়ছেন অনেক কৃষক। এখন আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে আমাদের যেমন প্রয়োজন ছিল কৃষিকে আধুনিকায়ন করা। তেমনি প্রয়োজন দেশের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে কৃষক যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সেটা নিশ্চিত করা। কৃষকরা যদি বাড়তি দাম দিয়ে ফসল উৎপাদন করতে হয় এবং ফসল উৎপাদনের পর পরিবহন সংকটে পড়ে ফসল নষ্ট হয় তা আমাদের দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কারণ কোনো জায়গায় ফসল নষ্ট হবে, কোনো জায়গায় মানুষ খেতে পারবে না। চাহিদা আর জোগানের ভারসাম্যহীনতা সমাজে খাদ্যসংকট প্রকোট করবে। যেহেতু খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা তাই সবার আগে নিরাপদ খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর বেশি মূল্যে খাদ্য ক্রয় করতে হলে, কিংবা উৎপাদনকারী শ্রেণি খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ না করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই বৈশ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের ও সংকট মোকাবিলায় নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে, সঠিক পরিকল্পনা আর নীতিনির্ধারণ আমাদের সংকট থেকে উত্তরণে সাহায্য করবে।
কৃষকরা যাতে সঠিক সময়ে উৎপাদন করতে পারে তাই কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও তৎপর হতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে, ন্যায্য মূল্যে ও প্রয়োজন অনুসারে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা, কৃষিপণ্য সময় মতো বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা, পরিবহন সুবিধা বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষি খাতে দুর্নীতি হ্রাস করা এবং কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে প্রকৃত কৃষকরা পায়, তা নিশ্চিত করা আর সবার উচিত কৃষকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়া। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এখনই প্রয়োজন কৃষি খাতে নজর দেওয়া।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়