প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা, এই শহরকে কেউ বলে সম্ভাবনার রাজধানী, কেউ বলে স্বপ্নের কারখানা, আবার কারও কাছে এটি নিঃশব্দ যন্ত্রণার এক অন্তহীন ভূগোল। এখানে জন্ম নেওয়া মানে শুধু একটি শহরের নাগরিক হওয়া নয়; বরং এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা, যেখানে প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি স্বপ্ন যেন অদৃশ্য কোনো বোঝা বয়ে নিয়ে চলে।
এই শহরের সকাল শুরু হয় সূর্যের আলো দিয়ে নয়, বরং ধোঁয়াটে এক কুয়াশার মতো বিষাক্ত বাতাস দিয়ে। এখানে শ্বাস নেওয়া মানে যেন অদৃশ্য বিষ গিলে ফেলা। বাতাসে মিশে থাকে ধুলা, কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া; সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়াটাই হয়ে ওঠে এক ধরনের সংগ্রাম। শিশুদের ফুসফুস এখনও পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তারা শিখে যায় কীভাবে দূষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। বয়স্কদের কাশি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট যেন এই শহরের নিত্যসঙ্গী। এমন এক শহরে জন্ম নেওয়া, যেখানে বাতাসই শত্রু, সেখানে জীবন শুরু হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধে।
পানির গল্পও আলাদা নয়। যে পানি জীবন দেয়, সেই পানিই এখানে অনেক সময় রোগের বাহক হয়ে ওঠে। পাইপলাইনের জীর্ণ অবস্থা, দূষিত নদী, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা; সব মিলিয়ে বিশুদ্ধ পানি যেন বিলাসিতার নাম।
অনেকেই প্রতিদিন যে পানি পান করে, তা কতটা নিরাপদ, তা জানার সুযোগও পায় না। দরিদ্র মানুষদের জন্য তো বোতলজাত পানি স্বপ্নের মতো; তারা বাধ্য হয় যা পায়, তাই গ্রহণ করতে। ফলে অসুখ-বিসুখ যেন জীবনেরই অংশ হয়ে যায়। এই শহরে জন্ম নেওয়া মানে শুধু বাঁচার জন্য লড়াই নয়, সুস্থ থাকার জন্যও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা।
শব্দ, যা একসময় ছিল যোগাযোগের মাধ্যম, এখানে তা হয়ে উঠেছে মানসিক নির্যাতনের অস্ত্র। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, মানুষের ভিড়, বাজারের কোলাহল; সব মিলিয়ে এক অস্থির শব্দের জগত। এই শহরে নীরবতা এক বিলাসিতা, যা শুধু কল্পনায় পাওয়া যায়। প্রতিদিনের এই শব্দ দূষণ মানুষের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে, মনকে অস্থির করে তোলে। অনেকেই বুঝতে পারে না, কেন তারা সবসময় বিরক্ত, কেন তাদের মধ্যে অজানা এক চাপ কাজ করে। কিন্তু তার একটি বড় কারণ এই নিরবচ্ছিন্ন শব্দের আক্রমণ।
আর যানজট? সে তো এই শহরের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক।
এখানে সময় যেন রাস্তার মধ্যেই আটকে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ বসে থাকে, সামনে এগোনোর কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া। একটি ছোট দূরত্ব পাড়ি দিতে লাগে অজস্র সময়, আর সেই সময়ের মধ্যে জমা হয় ক্লান্তি, বিরক্তি, হতাশা। একজন কর্মজীবী মানুষ তার জীবনের একটি বড় অংশ কাটিয়ে দেয় এই যানজটে বসে থেকে। শিক্ষার্থীরা দেরিতে পৌঁছায়, রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে যেতে পারে না, শ্রমিকরা কাজ হারায়; সবকিছুর কেন্দ্রে থাকে এই অচলাবস্থা। এই শহরে জন্ম নেওয়া মানে সময়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই সমস্যাগুলোর মূল শিকড়। এখানে শহর গড়ে উঠেছে পরিকল্পনা দিয়ে নয়, বরং প্রয়োজন আর লোভের অদৃশ্য সমীকরণে। রাস্তা সংকীর্ণ, ফুটপাত দখল হয়ে যায়, খেলার মাঠ হারিয়ে যায় কংক্রিটের নিচে। নতুন নতুন ভবন উঠে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না সুযোগ-সুবিধা। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এই শহর যেন নিজেই নিজের ওজন বহন করতে পারছে না, তবুও প্রতিদিন তাকে আরও ভারী করা হচ্ছে।
সংকীর্ণ বাসস্থান এই শহরের আরেকটি নির্মম বাস্তবতা। হাজারো মানুষ গাদাগাদি করে থাকে ছোট ছোট ঘরে, যেখানে ব্যক্তিগত জায়গা বলতে কিছুই নেই। একটি পরিবারের জন্য যে জায়গা প্রয়োজন, সেখানে থাকে দুই বা তিনটি পরিবার। আলো-বাতাস ঢোকার সুযোগ কম, ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু এর মধ্যেই মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে, হাসার চেষ্টা করে, স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে। এই সংকীর্ণতা শুধু জায়গার নয়, অনেক সময় তা মানসিকতার ওপরও প্রভাব ফেলে। মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায় সীমাবদ্ধতার সঙ্গে, আর সেই অভ্যাসই তাদের বড় স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে ক্ষীণ করে দেয়।
অসাম্য এই শহরের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোর একটি। এখানে একই রাস্তায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে অট্টালিকা আর বস্তি। একদিকে বিলাসবহুল জীবন, অন্যদিকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এই বৈপরীত্য এতটাই স্পষ্ট যে তা উপেক্ষা করা যায় না। একজন শিশু যখন দেখে তার সমবয়সী কেউ বিলাসে বড় হচ্ছে আর সে নিজে বঞ্চনায়, তখন তার মনে জন্ম নেয় প্রশ্ন, ক্ষোভ, কখনও কখনও বিদ্বেষ। এই অসাম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সুযোগেরও অসাম্য, যা মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।
চাকরির জন্য আসা লাখ লাখ তরুণ এই শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প। তারা আসে স্বপ্ন নিয়ে, আশা নিয়ে, পরিবারকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু এই শহর তাদের সবার জন্য জায়গা করে দিতে পারে না। অনেকেই কাজ পায় না, কেউ কেউ অপ্রতুল বেতনে কাজ করে, আবার কেউ কেউ হতাশায় ভেঙে পড়ে। তাদের অনেকেই থাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, খায় অল্প, বাঁচে কষ্টে। তবুও তারা ফিরে যায় না, কারণ ফিরে গেলে স্বপ্ন ভেঙে যাবে। এই শহর তাদের আশ্রয় দেয়, আবার একই সঙ্গে তাদের পরীক্ষা নেয় প্রতিনিয়ত।
এই সবকিছুর মধ্যেও মানুষ বেঁচে থাকে। তারা ভালোবাসে, হাসে, সম্পর্ক গড়ে তোলে, আবার ভেঙেও যায়। এই শহর তাদের কষ্ট দেয়, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেই তারা খুঁজে নেয় জীবনের অর্থ। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন এমন একটি শহরে জন্ম নেওয়া, যেখানে প্রতিটি দিন সংগ্রামের, প্রতিটি শ্বাসে কষ্ট, প্রতিটি স্বপ্নে অনিশ্চয়তা? তখনই মনে হয়, এই শহরে জন্ম নেওয়াটাই যেন এক আজন্ম পাপ, যার শাস্তি মানুষ বয়ে বেড়ায় সারাজীবন।
এই শহরকে বদলানো সম্ভব, যদি ইচ্ছা থাকে, যদি পরিকল্পনা থাকে, যদি মানবিকতা থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত শহর মানে শুধু রাস্তা, ভবন বা যানবাহন নয়; শহর মানে মানুষ।
আর মানুষই পারে একটি শহরকে নরক থেকে স্বর্গে রূপান্তর করতে। কিন্তু সেই পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত, এই শহরের অনেক মানুষের মনে একই অনুভূতি বেঁচে থাকবে; এখানে জন্ম নেওয়া যেন এক আজন্ম পাপ, এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়