প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার’
রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধনুকের হার।
কালোয় যে জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,
তারির পদ রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন।
পঙক্তিগুলো কবি জসীম উদ্দীনের রূপাই কবিতার। আজকের লেখাটি পঙক্তিগুলোর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক তাই তা দিয়েই শুরু করলাম। যেকোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা আর তাই আমাদের দেশেও স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৯৭ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের কাছাকাছি। বাকিরা পড়াশোনা করছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত বেসরকারিভাবে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবৈতনিকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই পড়াশোনা করছে নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ সব পরিসংখ্যান থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে যায় সব শিশুর জন্য ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা কি সম্ভব হয়েছে? সম্প্রতি এই অবস্থায় নতুন করে আরও একটি প্রশ্ন আবির্ভূত হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে। সরকার আবারও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির কথা বলছে।
নির্বাচিত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ পরবর্তী স্বল্প সময়ের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন : শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পর বাইরে অযথা ঘোরাঘুরি নিরুৎসাহিত করে পড়ার টেবিলে সময় দেওয়া, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের নতুন নীতিমালায় পুনঃভর্তি ফি বাতিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ, শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে থেকে পুল গঠন, শিক্ষকদের প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন-ভাতা, পেনশন, বদলি ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্নের ওপরও জোর প্রদান, নকল প্রতিরোধে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত এবং চলমান এসএসসি পরীক্ষায় বিভিন্ন বাস্তব দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ। সব ইতিবাচক উদ্যোগগুলো প্রশংসার দাবি রাখলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব অনেক বেশি আলোচনা ও সমালোচনার দাবি রাখে। সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা বিজ্ঞান ভিত্তিক মনোপেশিজ আচরণ, ন্যায়সংগত শিশু কেন্দ্রীক অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থাকে চিন্তা করেই লটারি ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল।
যাতে করে শিশুদের মানসিক বিকাশের পর্যায়ে পরীক্ষা ভীতির চাপ না সৃষ্টি হয়। যে শ্রেণিতে অক্ষরজ্ঞান অর্জনের সূচনা হয় সেখানে প্রবেশ করতে প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার নিয়ম প্রচলন শুধু অযৌক্তিক চিন্তাই নয় পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশে শিক্ষার প্রায় সব স্তরে, বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত কোচিংব্যবস্থার ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রায় দেড় দশক আগে স্কুলগুলোয় ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির নিয়ম চালু করা হয়েছিল। এখন পুনরায় পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করলে আবার কোচিং বাণিজ্য দেখা দেবে। যা স্পষ্ট ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা উন্নয়নে অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে।
বাবা-মায়ের ইচ্ছে ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে কোচিং এর খপ্পরে পরে কোমলপ্রাণ শিশুদের দৈনন্দিন জীবন যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখনি সমতা ও স্বচ্ছতা ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করতে লটারি ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। এতে করে অস্বাস্থ্যকর ভর্তি পরীক্ষা প্রতিযোগিতার জন্য কোচিং ও ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে লটারি পদ্ধতিতে দুর্নীতি হয় এই অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়ে থাকে তার দায়ভার তো কোমলপ্রাণ শিশুদের নয়। এটার জন্য সিস্টেম ঠিক করুণ। মাথা ব্যাথা করলে চিকিৎসা করুন, তাণ্ডনা করে মাথা কেটে ফেললে আখেরে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭তম অনুচ্ছেদে আইন দিয়ে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের প্রতি নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলা রয়েছে।
একই সঙ্গে এতে একই ধরনের গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতেরও কথা বলা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এ আইন প্রণয়নের তিন দশকের পরও এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের ও অবৈতনিক শিক্ষা কার্যকর করা যায়নি। এখনও বাস্তবিকপক্ষে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিশু শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আইন থাকলেও বাস্তবে মাঠক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। লটারি পদ্ধতি সমাজব্যবস্থায় ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে, এই পদ্ধতিতে অন্তত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের সুবিধাজনক স্থানে এবং নিজের পছন্দসই স্কুলগুলোর দরজা খুলে দিয়েছিল। একজন দরিদ্র মানুষও তার সন্তানকে লটারির মাধ্যমে নামকরা মানসম্পন্ন স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারতেন।
এছাড়া শিশুদের পরীক্ষার আতঙ্কে পড়তে হতো না। সব শিশু সমান সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন পরিবেশ থেকে আসে না। ভর্তি পরীক্ষা নিলে দেখা যায়, সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুরাই নামকরা মানসম্পন্ন স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। এতে শুরুতেই শিশুদের মনে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। লটারি পদ্ধতি এই বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। দায়িত্বশীল কর্তা ব্যক্তিরা যদি মনে করেন মেধা যাচাই ছাড়া সব মানের শিক্ষার্থী ভর্তির ফলে ক্লাসের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাহলে পাশাপাশি এটাও তাদের মাথায় রাখা দরকার এই ধরনের চিন্তাভাবনা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অন্তরায়। এর ফলে সাময়িক ভাবে লাভের পাল্লা দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মোটেও শুভফল বয়ে আনবে না।
যে স্তরে আমাদের কোমলপ্রাণ শিশুরা বর্ণ পরিচয় শিখবে তার আগেই কোনো শিশুর কাছ থেকে পড়া বা লেখা সম্পর্কিত দক্ষতা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। এই স্তরে শিশুর শেখা উচিত খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প শোনা, এবং সামাজিক আচরণ। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার কারণে অভিভাবকরা শিশুদের আগেভাগেই পড়াশোনার চাপ দিতে শুরু করেন। ফলে শিশুর স্বাভাবিক শৈশব ব্যাহত হয় এবং শেখার প্রতি আগ্রহের পরিবর্তে ভীতি তৈরি হতে পারে। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হলে সেটি প্রাথমিক স্তরের পরে করা ভালো। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের যে বয়স তাতে পরীক্ষা পদ্ধতি শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর চাপ সৃষ্টি করবে। পরীক্ষা মানে শিক্ষাজীবনে ধাপ ডিঙানোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যম।
একজন শিক্ষার্থী বয়সের ধাপে ধাপে কীভাবে এবং কী শিখেছে, তা প্রতিযোগিতার আদলে যাচাই করার জন্যই পরীক্ষা নেওয়া হয়। তাহলে কিছু শেখানোর আগেই ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের মতো প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত কেন চাপিয়ে দেওয়া হবে? শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা আনন্দদায়ক। অথচ আমরা শিক্ষা জীবন শুরুর আগেই শিশু শিক্ষার্থীদের আনন্দময় জীবন থেকে বঞ্চিত করতে উঠেপড়ে লেগেছি। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু রয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগ শিক্ষা অবকাঠামো ও পরিকল্পনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষা পরিকল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয়কে সংযুক্ত করা হয় না। শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিকল্পনায় আমাদের কর্তাব্যক্তিদের উচিত এসব শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা। শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাকে কেনা-বেচার পণ্যে পরিনত করা কাম্য নয়।
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালু হলে সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে। যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তারা শিশুদের কোচিং বা প্রস্তুতির সুযোগ করে দিতে পারবে। অন্যদিকে, নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে মেধার চেয়ে আর্থিক সামর্থ্যই ভর্তি নির্ধারণে বেশি ভূমিকা রাখবে, যা শিক্ষার মৌলিক নীতির পরিপন্থি।
মো. তাহমিদ রহমান
শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক