ঢাকা রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ক্যাম্পাস রাজনীতি : নেতৃত্বের পাঠশালা নাকি সহিংসতার ক্ষেত্র

আবু সাঈদ সিনান, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস রাজনীতি : নেতৃত্বের পাঠশালা নাকি সহিংসতার ক্ষেত্র

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত বিষয়গুলো হচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রিনিউঅ্যাবল এনার্জি সোর্চ, মহাকাশ গবেষণা এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো যেগুলোর এক কদম সফলতা পৃথিবীর গতিপথকে পাল্টে দিতে পারে।

ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে বহুল আলোচিত বিষয়গুলো হচ্ছে- রাজনৈতিক সহিংসতা, জীবনমানের ক্রমাগত অধঃপতন, ছাত্রসংগঠনগুলোর পারস্পরিক হানাহানি এবং লেজুড়বৃত্তির উন্মাদ প্রতিযোগিতা। বিশ্বের যেকোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সবচেয়ে বড় স্টেইকহোল্ডার (অংশীদার) সেই রাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্ররা।

এই দুইয়ের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা একটি দেশকে এক শতাব্দী পরিমাণ অগ্রসর করতে সক্ষম। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এশিয়ার দুটি দেশ চীন ও জাপান। পারমাণবিক আক্রমণে বিধ্বস্ত জাপান ও একশ বছর আগের দুর্ভিক্ষপীড়িত চীন কীভাবে বিগত এক শতাব্দীতে উন্নতির শেখরে আরোহণ করলো, তা চিন্তার খোরাক যোগায়। অপরদিকে এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময়ী দেশ বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারকবাহক ছাত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেই ক্ষিপ্র গতিতে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব কালচার, হত্যাকাণ্ড ও পাওয়ার পলিটিক্সের দিকে ধাবিত হচ্ছে ঠিক একই গতিতে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে।

ক্যাম্পাসগুলো সৃজনশীলতা ও গবেষণার আঁতুরঘর থেকে সন্ত্রাসবাদের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। সহিংসতার এই উত্থানের পিছনে বেশ কয়েকটি প্রভাবক কাজ করে, যেমন- ছাত্ররাজনীতিতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রান্তিকতা এবং ক্ষমতা এককেন্দ্রিকীকরণ।

জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ক্যাম্পাস সহিংসতার অন্যতম কারণ। এর মাধ্যমে দলগুলো তাদের প্রতিপত্তি জানান দিতে চায় এবং ছাত্রসংগঠনগুলোকে নগ্নভাবে ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের অসহায়ত্বের দরুন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে বিরত থাকে। ফলে ছাত্ররাজনীতিবিদদের দ্বারা সংঘটিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে উঠে না। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্তিশালী ছাত্রসংগঠনের উপস্থিতি হাতেগোনা দুটি বা তিনটি এবং বাকি সংগঠনগুলো কাঠামোগত ভাবে শক্তিশালী নয়। ফলশ্রুতিতে ক্ষমতা নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে এবং সহিংসতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এখন ক্যাম্পাস রাজনীতি আদতে নিষিদ্ধ নাকি সংস্কারের দাবি রাখে, তা বিবেচনার বিষয়।

ক্যাম্পাস রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে বেশকিছু সংকট ও শূণ্যস্থান তৈরি হয়, যেমন- ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, শিক্ষার্থীদের বাস্তবিক নেতৃত্বদানের গুণাবলী অর্জন, ছাত্র ও প্রশাসনের পারস্পরিক জবাবদিহিতা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি উত্থাপন (Voice Rising) এবং স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার। এছাড়াও ক্যাম্পাস রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও ছাত্রদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব। ফলত, ক্যাম্পাস রাজনীতি নিষিদ্ধ নয় বরং ব্যাপক পরিসরে সংস্কারের দাবি রাখে।

ফলপ্রসূ ছাত্ররাজনীতি পেতে গেলে যে যে জায়গায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হলো- দলনিরপেক্ষ ছাত্র ইউনিয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, বহুদলীয় ও বহুপাক্ষি অংশগ্রহণ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি।

যখন ছাত্ররাজনীতিতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে না (যদিও দলীয় প্রভাব নিঃশেষ করা অসম্ভব) এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার আওতায় আসবে তখন সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। বহুপাক্ষিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে ক্ষমতা এককেন্দ্রিক হওয়া রোধ হবে এবং সংঘর্ষ নিম্নমুখী হবে।

ক্যাম্পাসে রাজনীতির জায়গাটা জবাবদিহিমূলক, নিয়ন্ত্রিত ও সুসংগঠিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেতৃত্ব তৈরি, গবেষণা ও সৃজনশীলতায় কয়েক ক্রোশ এগিয়ে যাবে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করে বৈশ্বিক মর্যাদায় বাংলাদেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে সক্ষম হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত