ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ডেটা ইকোনমি : তথ্যের উপনিবেশে বন্দি আধুনিক সভ্যতা

জান্নাতি খাতুন
ডেটা ইকোনমি : তথ্যের উপনিবেশে বন্দি আধুনিক সভ্যতা

রাতের নিস্তব্ধতায় একটি অচেনা শহরের আঁধারের গালিচার এক কোণে বসে থাকা এক তরুণ হঠাৎ অবলোকন করল, তার মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠছে এমন সব বিজ্ঞাপন যেগুলো সে কাউকে কখনও বলেনি। এগুলো সে দিব্যি নীরবে নিভৃতে নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে, তবুও যেন তার মনের গোপনতম ইচ্ছাগুলো সেখানে উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। সে বিস্মিত হয়ে ভাবে কে তাকে এত গভীরভাবে আবিষ্কার করল! কে তার অদৃশ্য সত্তার ভেতরে প্রবেশ করল? অথচ বাস্তবতা হলো, সে নিজেই প্রতিদিন অজান্তে, অবলীলায় নিজের জীবন, অভ্যাস, পছন্দ, ভয় আর স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিচ্ছে অগণিত ডিজিটাল সরণিতে। সেই ছড়িয়ে পড়া অদৃশ্য কণাগুলো একদিন গড়ে তোলে এক নতুন অর্থনীতি, যার নাম ডেটা ইকোনমি।

ডেটা ইকোনমি মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে তথ্যই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যেখানে মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত, পছন্দ, চলাফেরা, এমনকি তার নীরবতাও পরিণত হয় অর্থনৈতিক সম্পদে। এখানে পণ্য মানে আর শুধু দৃশ্যমান বস্তু নয় বরং অদৃশ্য তথ্যের প্রবাহ, যেখানে ডেটা সংগ্রহ করা হয়, বিশ্লেষণ করা হয় এবং সেই বিশ্লেষণ থেকে তৈরি হয় নতুন নতুন বাণিজ্যিক মডেল। এই অর্থনীতিতে তথ্য শুধু সহায়ক নয় বরং মূল চালিকাশক্তি, যেমন শিল্প বিপ্লবে যন্ত্র ছিল শক্তির উৎস, তেমনি ডিজিটাল যুগে ডেটাই হয়ে উঠেছে নতুন শক্তি। প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি সার্চ, প্রতিটি অনলাইন আচরণ একেকটি অর্থনৈতিক সংকেত হিসেবে কাজ করে।

ডেটা ইকোনমির ধারণা বোঝার জন্য আমাদের বুঝতে হবে তথ্যের তিনটি স্তর, প্রথমত, ডেটা সংগ্রহ, যেখানে ব্যবহারকারীর প্রতিটি কার্যকলাপ সংরক্ষিত হয়। দ্বিতীয়ত, ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করে প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। তৃতীয়ত, ডেটার ব্যবহার, যেখানে সেই বিশ্লেষণ থেকে তৈরি হয় সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়িক কৌশল এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের অদৃশ্য শিল্প যেখানে কারখানা নেই কিন্তু উৎপাদন আছে, শ্রমিক নেই কিন্তু শ্রম আছে। আর সেই শ্রমিক হলো সাধারণ মানুষ যারা নিজের অজান্তেই এই অর্থনীতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।

ডেটা ইকোনমি আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোকে গভীরভাবে পরিবর্তন করছে, আগে যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ বা শিল্প উৎপাদন ছিল অর্থনীতির ভিত্তি, সেখানে এখন তথ্য হয়ে উঠেছে মূল চালিকাশক্তি। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেভাবে মানুষের ডেটা ব্যবহার করে নিজেদের বাজার বিস্তৃত করছে তা এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক আধিপত্য তৈরি করছে। এখানে ক্ষমতা নির্ধারিত হচ্ছে কে কতো বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং কে সেই তথ্যকে কতো দক্ষভাবে ব্যবহার করতে পারে। ফলে একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে যেখানে দেশ, কোম্পানি এবং ব্যক্তির মধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের বৈষম্য।

ডেটা ইকোনমির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, আজকের মানুষ যেভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় বরং একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম, প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, প্রতিটি অনলাইন কেনাকাটা, প্রতিটি লোকেশন শেয়ারিং আসলে একটি অর্থনৈতিক লেনদেনের অংশ, যেখানে মানুষ পণ্য নয় কিন্তু তার আচরণ পণ্য হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি ডেটা প্রোফাইলে, যেখানে তার পরিচয় নির্ধারিত হয় তার আচরণগত তথ্য দ্বারা।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, এই অর্থনীতি কি মানুষের জন্য আশীর্বাদ নাকি এক নতুন শোষণের রূপ? একদিকে ডেটা ইকোনমি নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, যেমন ব্যক্তিগতকৃত সেবা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নত প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে, এটি তৈরি করছে গোপনীয়তার সংকট, তথ্যের অপব্যবহার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আজ যে পরিমাণ তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে তা অনেক রাষ্ট্রের ক্ষমতার চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। ফলে প্রশ্ন ওঠে এই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত?

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ব অর্থনীতিতে ডেটার মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় আমরা দেখতে পাই, আগামী দশকে ডেটা নির্ভর অর্থনীতির পরিমাণ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্য, উন্নত দেশগুলো যেখানে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর মাধ্যমে ডেটা থেকে লাভবান হচ্ছে সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রে শুধু ডেটার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে একটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে যা আগের উপনিবেশিক কাঠামোর সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডেটা ইকোনমি মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে, কারণ যখন প্রতিটি আচরণ নজরদারির আওতায় আসে তখন ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক আচরণ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে বলা যায় যে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নীতিগত নিয়ন্ত্রণ থাকলে ডেটা ইকোনমি মানুষের জীবনকে আরও সহজ এবং সমৃদ্ধ করতে পারে। এখানে মূল বিষয় হলো ভারসাম্য, যেখানে উদ্ভাবন এবং নৈতিকতার মধ্যে একটি সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। আমার দৃষ্টিতে ডেটা ইকোনমি এক দ্বিমুখী বাস্তবতা, এটি যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে তেমনি ঝুঁকিরও জন্ম দেয়। তাই আমরা যদি এটিকে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা এর সামাজিক ও নৈতিক দিকগুলো উপেক্ষা করব। আবার যদি এটিকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখি তাহলে আমরা এর সম্ভাবনাগুলো হারিয়ে বসব। এমতাবস্থায়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে ডেটাকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয় বরং মানবিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ডেটা ইকোনমি একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এখানে বিপুল জনসংখ্যা এবং দ্রুত ডিজিটালাইজেশন একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। যদি সঠিক নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় তাহলে বাংলাদেশ এই নতুন অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। যেন মানুষ বুঝতে পারে, তার তথ্যের সঠিক মূল্য এবং সেই তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব।

জান্নাতি খাতুন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত