ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট কর ফাঁকি রাজস্ব উন্নয়ন ও সুশাসনের অন্তরায়

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট কর ফাঁকি রাজস্ব উন্নয়ন ও সুশাসনের অন্তরায়

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও শিল্প উৎপাদনে এদেশে বিপুল সম্ভবনা রয়েছে। একসময় পাট, চা, চামড়া ছিল এ দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমান শিল্প প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারের ফলে এদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিদেশে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান। বাংলাদেশে তৈরি পানির জাহাজ, ঔষধ, ইলেকট্রনিক পণ্য, কৃষি পণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিকসহ অসখ্য পণ্য সারা বিশ্বে রপ্তানি হচ্ছে। দেশ বিদেশে পণ্যদ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করে যে পরিমাণ কর-শুল্ক আদায় করার কথা সেই ন্যায্য পরিমাণ কর-শুল্ক সরকার পায় না। দেশের করব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব নয়। হয়রানির ভয়ে অনেকে কর দিতে চান না। আবার কর ফাঁকি দিয়েও একশ্রেণির ব্যবসায়ী পার পেয়ে যাচ্ছেন। ধনী কর্পোরেট ব্যবসায়িরা সবচেয়ে বেশি কর ফাঁকি দেন। তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময় থেকে ব্যবসায়িদের মধ্য ব্যাপক হারে কর-শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ দেশে কর ফাঁকি দিয়ে পার পাওয়া যায়- এমন বার্তাও সমাজে প্রচলিত আছে। সরকারের কর্তাব্যক্তি ও কর আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারীরা ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকি ও মওকুফে সহায়তা করে আসছে। যদি পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে উপযুক্ত ও নির্ধারিত হারে কর-শুল্ক আদায় করা যেত তাহলে সরকার প্রচুর রাজস্ব লাভ করত এবং এক সময় বাংলাদেশটা সিঙ্গাপুর-কানাডায় পরিণত হতো। এদেশের বড় বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতি এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ অলিগার্করা সরকারকে অবৈধ ফায়দা দিয়ে হাজার লাখ কোটি টাকা কর-শুল্ক মওকুফ করে নিচ্ছে। যুগ যুগ ধরে এই কার্যক্রম অভ্যহত রয়েছে।

অনেকেই কর ফাঁকি দিয়ে পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করেন, যা দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করছে। কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী কী ক্ষতি হচ্ছে এবং এর প্রতিকার কী তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয় কিন্তু কোন কার্যকর প্রতিকার হয় না। আসলে কর ফাঁকি এক ধরনের ভদ্রবেশী অপরাধ। সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, কর্পোরেট সংস্থা বা সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানি কর্তৃক তাদের পেশাগত কাজের প্রক্রিয়ায় এমন কিছু অপরাধমূলক কাজ করে থাকে যা ভদ্রবেশী অপরাধ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন- আয়কর ফাঁকি, ভ্যাট জালিয়াতি, আমদানি শুল্ক কম পরিশোধ, আবগারি শুল্ক যথাযথভাবে পরিশোধ না করা ইত্যাদি। এই ভদ্রবেশী অপরাধের প্রভাব সমাজে মারাত্মক। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশে কর ফাঁকির কারণে সরকার ২০২৩ সালে (২০২২-২৩ অর্থবছর) আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। এর মধ্যে কর্পোরেট কর ফাঁকির পরিমাণই অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ গত ১৫ বছরে দেশে কর ফাঁকির পরিমাণ কয়েকগুণের বেশি হয়েছে। একদিকে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান কর দিতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ কোম্পানি জানিয়েছে, কর্পোরেট কর দেওয়ার সময় কর কর্মকর্তারা ঘুষ চেয়েছেন।

সিপিডির মতে, কর ফাঁকির মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ করহার, দুর্বল নজরদারি, জটিল আইন-কানুন ও কর ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কর ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক কর ফাঁকি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং আইনের প্রতি অনুগত নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত কম, কারণ এ দেশে জনসংখ্যার তুলনায় খুব কম লোক প্রত্যক্ষ কর দেন। আবার যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপরেই কর দেওয়ার চাপ বেশি। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও করের আওতার বাইরে। কর ব্যবস্থায়ও গলদ আছে। যেমন কালোটাকা সাদা করার সুযোগ। একজন করদাতা নিয়মিতভাবে উচ্চ হারে কর দিলেন। কিন্তু সরকার ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিল। ফলে কর ফাঁকি দিয়ে যাঁরা টাকা লুকিয়ে রাখলেন, তাঁরা বেশি সুবিধা পেলেন। এটি সৎ করদাতাদের জন্য অন্যায় নীতি। এ কারণেও অনেক করদাতা কর দিতে চান না। কর প্রদানে মিথ্যা ঘোষণা অনেক দিন ধরে চলে আসছে। ?প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় করের ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ কম দেখায়। আবার আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু তা-ই নয়, বিদেশে অর্থ পাচারের একটা বড় অংশ যায় আমদানি-রপ্তানি দ্রব্যমূল্যের ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে।

দেশের তামাক খাতে অসম কর শুল্ক আরোপ করায় বাজারে বিক্রি হওয়া মোট সিগারেটের ১৫ শতাংশই কর ফাঁকি দেওয়া অবৈধ। এতে করে বছরে প্রায় ১৮০০ কোটি শলাকা করের বাইরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে সিগারেটের উপর ৮৩ শতাংশ ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। দেশের বেশিরভাগ সাবরেজিষ্ট্রি অফিসের সরকারি রাজস্ব খেয়ে ফেলছে একশ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ সাবরেজিস্টার, দলিল লেখক ও নকলনবিশ কর্মকর্তা। ঘুষ-কমিশন সিন্ডিকেটের সদস্যরাই রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এর ফলে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সরকার তার প্রাপ্য রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত- সবকিছুর মূল ভিত্তি রাজস্ব। অথচ এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নানা কৌশলে এই রাজস্ব ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। দেশে এক কোটির বেশি টিআইএন থাকলেও রিটার্ন জমা দিচ্ছেন অর্ধেকের কম। প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে ব্যক্তি ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত কর ফাঁকি দিচ্ছে। কর ফাঁকি ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কারণে সরকার বছরে লক্ষ কোটি রাজস্ব হারাচ্ছে।

ছোট বড় ব্যবসায়িরা বন্দরে পণ্য খালাসে জড়িত সরকারি কর্মকর্তা ও সিএনএফ এজেন্টদের ম্যানেজ করে এক পণ্যের আড়ালে বিকল্প পণ্য আমদানি করে আবার বড় পণ্যের চালানে কম পণ্য দেখিয়ে কর-শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে। করদাতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ ধরনের কর ফাঁকির ঘটনা অহরহ ঘটলেও এর খুব কমই জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। এ ধরনের অসৎ কর্মকর্তাদের জন্য করদাতারা কর ফাঁকি দিতে উৎসাহিত হয় এবং সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

কর ফাঁকির কারণে সরকারের যে ক্ষতি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- প্রথমত, কর হল সরকারের প্রধান আয়ের উৎস। যখন জনগণ কর প্রদান থেকে বিরত থাকে, তখন সরকারের রাজস্ব আয় কমে যায়। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি খাতে সরকারের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিতে হয় মূলত কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব দিয়ে। কর ফাঁকি দেওয়ার ফলে এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, যেসব ব্যবসায়ীরা কর প্রদান করেন না, তারা কর প্রদানকারী ব্যবসায়ীদের তুলনায় অসাধু প্রতিযোগিতার সুযোগ পান। এর ফলে সৎ ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকতে কষ্ট পায় এবং অনেক সময় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। চতুর্থত, কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত