প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ মে, ২০২৬
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ কিংবা মৌলভীবাজার- বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই হাওর জনপদে এখন একটাই দৃশ্য; পানি আর আতঙ্ক। বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান যখন গোলায় তোলার সময়, ঠিক তখনই হানা দিয়েছে অকাল বন্যা। অতিভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে অসংখ্য কৃষকের স্বপ্ন। এই দৃশ্য নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই এর অভিঘাত নতুন করে আমাদের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে।
হাওর অঞ্চলকে বাংলাদেশের ‘ধানের ভান্ডার’ বলা হয়। দেশের মোট বোরো ধানের একটি বড় অংশ এখান থেকেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি কিছুদিন ধরে চলমান এবারের বন্যায় প্রায় ২ লাখ থেকে ২.৫ লাখ জমির বোরো ফসল পানির নিচে চলে গেছে বলে বিভিন্ন কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে। যার মধ্যে, মৌলভীবাজার জেলায় ৮৯৭ হেক্টর,হবিগঞ্জে ৩৩৬০-৭০০০ হেক্টর ধান ডুবে গেছে, যার মধ্যে ৪ হাজার হেক্টর পুরোপুরিভাবে এবং ৩ হাজার হেক্টর ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত।
এছাড়াও, সুনামগঞ্জে প্রায় ৬০০ হেক্টর পাকা বোরো ধান, নেত্রকোনায় ৫০৭ হেক্টর ধান ডুবে গেছে, যেগুলোর অধিকাংশই হাওর অঞ্চলভুক্ত। যার মধ্যে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, নলুয়ার, মাটিয়ান, ওলিয়ার ও হাইল হাওর রয়েছে। এছাড়াও নেত্রকোনার বেশ কয়েকটি হাওরসহ পার্শ্ববর্তী জেলার হাওরগুলোতে ফসলের নজিরবিহীন ক্ষতির তথ্য মিলেছে।
গনমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, কৃষকরা ফসল ডুবে যাওয়া সত্ত্বেও নৌকায় করে জীবন বাজি রেখে তরিঘরি করে ফসল কেটে নিচ্ছে। এই ক্ষতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত লোকসান নয়- এটি জাতীয় খাদ্য উৎপাদনের ওপর সরাসরি আঘাত।
এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর। ফসলহানি মানেই বাজারে চালের সরবরাহ কমে যাওয়া, যার ফলে মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে ওঠে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। একই সঙ্গে কৃষকের ঋণগ্রস্ততা বাড়ে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন, কিন্তু ফসলহানির কারণে তারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ফাঁদে ফেলে দেয়। সামাজিক প্রভাবও কম নয়। হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হওয়ায় ফসল নষ্ট হলে দিনমজুর, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কর্মহীন হয়ে পড়ে।
ফলে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। তাছাড়া দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ২০২২ সালের পর এমন দুর্যোগ আবারও হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে- প্রতিবছর একই সংকট কেন ফিরে আসে? এর পেছনে রয়েছে কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাব। প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান- সিলেটের উত্তরেই ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি, যা বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা।ওখান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল মুহূর্তেই তলিয়ে দেয় বাংলাদেশর এসব অঞ্চল। দ্বিতীয়ত, হাওর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সময়মতো বাঁধ সংস্কার না করা এবং নিম্নমানের কাজ বন্যার ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র ও অনিয়মিত। তৃতীয়ত, নদ-নদীর নাব্যতা কমে পলি জমে হাওরাঞ্চলের নদীগুলো বৃষ্টির পানিকে বেশি পরিমাণে ধরে রাখতে পারে না। ফলে বৃষ্টির বাড়তি পানির চাপ নদীগুলো সইতে পারে না ও পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না, এর দরুন জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দ্রুত হাওরে ঢুকে পড়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, হাওর রক্ষা বাঁধগুলোকে টেকসই ও বিজ্ঞান ভিত্তিকভাবে নির্মাণ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করা, কারণ তারা হাওরের প্রকৃতি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। দুর্নীতি রোধে জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, আধুনিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা (Early Warning System) আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে কৃষকরা সময়মতো ফসল কাটার সুযোগ পান। তৃতীয়ত, বন্যা-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন ও কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে, ব্রি ধান-২৮ ও ২৯ এর পরিবর্তে আগাম ও বন্যা সহিঞ্চু জাতের (যেমন-ব্রি ধান-৮১ ও ৮৪) বোরো ধান চাষের সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়াও ফসল চাষে বৈচিত্র্যকরণ করা যেতে পারে। চতুর্থত, হিজল-করচ বন সংরক্ষণ করতে হবে। হাওরের প্রাকৃতিক ঢাল হিসবে কাজ করা হিজল-করচ বন পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে, যা পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা কমায়। পঞ্চমত, নদী খনন ও জলাধার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা উচিত।
সর্বশেষে, হাওরাঞ্চলের এই পুনরাবৃত্ত সংকটকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। কার্যকর নীতি, সুশাসন ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হাওরের কান্না তাই কেবল একটি অঞ্চলের নয়- এটি সমগ্র বাংলাদেশের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি। এখনই যদি আমরা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিই, তাহলে এই কান্না একসময় জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
তাপস রায় শুভ
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়