প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ মে, ২০২৬
শিশুর জন্য এক টুকরো সাজানো বাগান, সে তো সবারই চাওয়া। কিন্তু পথশিশুদের ভাগ্যে কি তা জোটে? অনাদরে-অবহেলায় মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে মলিন আর জীর্ণশীর্ণ জীবন তাদের। যাদের রোজকার জীবনে নেই আহারের নিশ্চয়তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকার তো আরও দূরের বিষয়।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, সুযোগসন্ধানীদের হাত ধরে পথশিশুরা জড়াচ্ছে গ্যাং সংস্কৃতি ও মাদক কারবারে। এমন বাস্তবতায় শিশু অধিকার কর্মীদের দাবি, শিশুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের। আর সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর বলছে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব শিশুর নেই কোন নাগরিক সুবিধা। নির্যাতন, অপুষ্টি আর নিরাপত্তাহীনতায় বেড়ে ওঠা ভয়াবহ এক শৈশব। যে বয়সটা পড়ার সময়, সেই বয়সে কাজে কেউ তাদের করে না আদর, নেয় না বুকে গুঁজে। ঝরা ফুলের মতোই ভাগ্য এসব শিশুদের।
অবহেলা আর অনাদর যাদের নিত্যসঙ্গী।
শিশু অপরাধের শাস্তি কম এবং সামান্য অর্থের বিনিময়ে অপরাধ করানো সম্ভব হওয়ায় অপরাধীদের সহজ টার্গেট ছিন্নমূল বা পথশিশু। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় পেশাদার অপরাধীরা পথশিশুদের দিয়ে অপরাধীরা করিয়ে নিজেরা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে। আবার সহজলভ্য হওয়ায় এসব শিশুকে অনেক সময় বিদেশেও পাচার করা হয়। পরিবারবিচ্ছিন্ন এসব শিশুর বসবাস বাস, রেল ও লঞ্চ টার্মিনাল। দেখা যায় ফুটপাত পার্কসহ খোলা জায়গাগুলোতেও। তাদের যাপিত জীবনের চিত্র যেন প্রতিনিয়ত ইঙ্গিত করে এরা সমাজের ‘অবাঞ্ছিত’ নাগরিক। এদের না আছে পরিবার না পায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা।
সড়ক কিংবা ফুটপাতের কিছু সাধারণ দৃশ্য আছে, যেগুলো সহজেই চোখে পড়ে। এই যেমন দল বেঁধে কাঁধে বস্তার মতো কিছু একটা নিয়ে হাঁটছে শিশুরা। এক হাত দিয়ে বস্তাটি ধরলেও তাদের অন্য হাতে দেখা যায় একটি পলিথিন। ফোলানো পলিথিনের মধ্যে প্রায়ই মুখ ঢুকিয়ে কিছু একটি শুঁকে নিচ্ছে তারা। ওই শিশুরা খেলাচ্ছলে পলিথিনের ভেতর নাক-মুখ ঢোকাচ্ছে না। তারা মূলত ‘ড্যান্ডি’ নেশায় আসক্ত। সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে পথশিশুরা। পাশাপাশি গাঁজাসহ অন্যান্য নেশাও করছে তারা। মাদকাসক্ত পথশিশুরা অন্য পথশিশুদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। নেশায় বুঁদ হয়ে বিভিন্ন সময়ে সহিংস কর্মকাণ্ড করছে তারা। জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে।
যার ভুক্তভোগী অন্য পথশিশুরা। অন্য পথশিশুদের কাছ থেকে টাকা-পয়সাও কেড়ে নেয় তারা। ‘ড্যান্ডি’ মূলত এক ধরনের আঠা। ‘ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ’ বা ‘ড্যান্ড্রাইট’ নামের আঠাটিকেই মাদক সেবীরা ‘ড্যান্ডি’ বলে চেনে। এই আঠা দিয়েই নেশা করে তারা। অল্প খরচে এই নেশা করা যায় বলে পথশিশুরা ঝুঁকে পড়ছে এতে। একজনের কাছ থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্যজনের কাছে। নেশা করার জন্য পথশিশুরা আঠাটি মুচির কাছ থেকে কিনে থাকে। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হয় এটি। এই আঠা দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, চামড়াসহ বিভিন্ন পণ্য জোড়া দেওয়ার কাজ করা হয়। পথশিশুদের মাদকাসক্ত হওয়া এখন এক মহামারি। সেভ দ্য চিলড্রেন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ঢাকার প্রায় ৪৪% থেকে ৫০% পথশিশু কোনো না কোনোভাবে মাদকের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ‘ডেন্ডি’ বা জুতো মেরামতের আঠা। ইউনিসেফ ও সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার তীব্র যন্ত্রণা ভুলে থাকতে তারা সস্তা ‘ডেন্ডি’ ব্যবহার করে, যা তাদের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। যার ফলে ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে থাকা সম্ভব হয়। পারিবারিক বিচ্ছেদ বা নির্যাতনের ট্রমা থেকে মুক্তি পেতে তারা নেশার পথে পা বাড়ায়। হার্ডওয়্যারের দোকানে খুব সস্তায় আঠা পাওয়া যাওয়ায় এটি তাদের প্রধান নেশায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের বেকারত্ব, মাদক, রাজনৈতিক অরাজকতা, খুন-খারাবি এই সব সমস্যার শিকড় খুঁজতে গেলে আমরা একটা জায়গায় এসে থমকে যায় পথশিশু। আজকের যে পথশিশু, আগামীকালের সেই অপরাধী, মাদকসেবী আর রাজনীতির হাতিয়ার।
বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বিশাল ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। ইউনিসেফের ‘চিলড্রেন ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৪ লাখেরও বেশি পথশিশু মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিসেফের ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী ৫-১৭ বছর বয়সী পথশিশুর সংখ্যা ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন।ঢাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিবিএস-এর মতে, দেশের মোট পথশিশুর প্রায় ৪৮.৫% ঢাকা বিভাগে অবস্থান করছে। ইউনিসেফের ২০২৪-২৫ সালের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই প্রায় চার লাখ ৫০০ জন শিশু খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। এদের মধ্যে ৩০.১% সরাসরি ফুটপাতে ঘুমায় এবং ৮২% শিশুর জন্য নেই কোনো বিছানা বা মশারি।
পথশিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ বলছে, প্রায় ৮২.৯% পথশিশু পথচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো না কোনোভাবে হেনস্তার শিকার হয়। মেয়ে শিশুদের অবস্থা আরো শোচনীয়। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ , আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, পথশিশুদের প্রায় ১৪.৫% নিয়মিত যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়। সামাজিক লোকলজ্জা এবং আইনি পরিচয়ের অভাবে এ অপরাধগুলোর বিচার হয় না বললেই চলে।
একটা শিশু যখন রাস্তায় বড় হয়, স্কুলে যায় না, কোনো দক্ষতা শেখে না, তখন বড় হয়ে সে বেকারই থাকে। তার হাতে কলমের বদলে থাকে ভিক্ষার থালা। শিক্ষা আর প্রশিক্ষণ ছাড়া এই বিপুল জনগোষ্ঠী দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী বেকার তরুণের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ বলছে, এই বেকারদের ৪৩% কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ পায়নি। UNICEF -এর ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১১ লাখ যাদের ৯০% এর কোনো প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়নি। এই শিশুরাই বড় হয়ে বেকারত্বের পরিসংখ্যান ভারী করে। বেকারত্বের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখি, তার শুরুটা এই রাস্তা থেকেই।