প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ মে, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। শিল্পায়ন, নগরায়ন ও সেবা খাতের সম্প্রসারণ সত্ত্বেও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের যে সাফল্য, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ অনেকাংশে আত্মনির্ভরতার পথে। এই সাফল্যের পেছনে উন্নত জাতের বীজ, সেচব্যবস্থা, কৃষকের শ্রম এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন কৃষিকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যাবে, খরচ কমানো যাবে, পরিবেশ রক্ষা করা যাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটির স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ন্যানো ফার্টিলাইজারের দিকে।
বাংলাদেশে ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনে। ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, ডিএপি ও অন্যান্য সার কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও ফলের ফলন বেড়েছে। কৃষকও উপলব্ধি করেছেন যে সারের ব্যবহার ফলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু ধীরে ধীরে একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- যত বেশি সার, তত বেশি ফলন। এর ফলেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, বিশেষ করে ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রে।
প্রচলিত রাসায়নিক সারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর ব্যবহার দক্ষতা কম। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার একটি বড় অংশ গ্যাস হয়ে উড়ে যায়, কিছু অংশ পানির সঙ্গে ধুয়ে চলে যায়, কিছু অংশ মাটিতে আটকে থেকে গাছের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক যে পরিমাণ সার জমিতে প্রয়োগ করেন, তার পুরোটা ফসল গ্রহণ করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ইউরিয়ার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ফসল ব্যবহার করতে পারে। বাকিটা অপচয় হয়ে পরিবেশ দূষণ, জলাশয় দূষণ, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং মাটির গুণগত অবনতি ঘটায়। সীমিত আবাদি জমি ও বাড়তি জনসংখ্যার দেশে এ ধরনের অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বাস্তবতায় ন্যানো ফার্টিলাইজার এক নতুন সম্ভাবনার নাম। ন্যানো সার হলো এমন এক ধরনের সার, যার কণাগুলো অতি ক্ষুদ্র- সাধারণত ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটারের মধ্যে। কণার আকার ছোট হওয়ায় এর পৃষ্ঠতল বৃদ্ধি পায়, দ্রবণীয়তা বাড়ে এবং উদ্ভিদ সহজে তা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ কম পরিমাণ সার ব্যবহার করেও বেশি কার্যকারিতা পাওয়া সম্ভব হয়। এ কারণেই ন্যানো সারকে ভবিষ্যতের কৃষিপ্রযুক্তি বলা হচ্ছে।
বিশেষভাবে ন্যানো ইউরিয়া এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রচলিত ইউরিয়ার বড় অংশ নাইট্রোজেন হিসেবে অপচয় হয়ে যায়। কিন্তু ন্যানো ইউরিয়া পাতায় স্প্রে বা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রয়োগ করলে গাছ দ্রুত তা শোষণ করতে পারে। ফলে কম ইউরিয়ায়ও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। এটি শুধু উৎপাদন বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়, বরং সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রযুক্তি।
বাংলাদেশের জন্য এ প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া আমদানি করতে হয়। সরকার কৃষকের স্বার্থে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে সার সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেই ভর্তুকির চাপও বাড়ে। এতে জাতীয় বাজেটের ওপর বড় চাপ পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাড়ে। যদি ন্যানো ইউরিয়ার মাধ্যমে ইউরিয়ার ব্যবহার কমানো যায়, তবে আমদানিনির্ভরতা কমবে, ভর্তুকির বোঝা হ্রাস পাবে এবং কৃষকও লাভবান হবেন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এ প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ইউরিয়া উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস একটি প্রধান উপাদান। গ্যাসের দাম বাড়লেই ইউরিয়ার দাম বাড়ে। এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের কৃষি খাতে। ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, জ্বালানি ঘাটতি সব মিলিয়ে সার সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ন্যানো সারের মতো বিকল্প প্রযুক্তি এখন শুধু গবেষণার বিষয় নয়, জাতীয় প্রয়োজনের বিষয়।
ন্যানো সারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো পরিবেশ সুরক্ষা। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। একই সঙ্গে জমি থেকে ধুয়ে যাওয়া সার নদী, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয়ে জমে পানি দূষণ ঘটায়। এতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। ন্যানো সার যদি এই অপচয় কমাতে পারে, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও ন্যানো সার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের বহু জমিতে দীর্ঘদিন একটানা চাষাবাদ, জৈবপদার্থের ঘাটতি এবং অসম সারের ব্যবহারে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। শুধু নাইট্রোজেন নয়, দস্তা, বোরন, লোহা, তামা ইত্যাদি অণুপুষ্টির ঘাটতিও অনেক এলাকায় রয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব পুষ্টি উপাদান নির্দিষ্টভাবে সরবরাহ করা গেলে ফসলের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও পুষ্টিমান বাড়তে পারে।
আশার কথা হলো, বাংলাদেশেও ন্যানো সার নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা ন্যানো ইউরিয়া ও অন্যান্য পণ্যের পরীক্ষামূলক ব্যবহার চালাচ্ছেন। দেশীয় প্রযুক্তিতে ন্যানো ইউরিয়া উদ্ভাবনের খবরও এসেছে।
এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ক্রেতা হয়ে থাকবে না; নিজস্ব বাস্তবতায় উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও সক্ষম।
তবে ন্যানো সারকে অলৌকিক সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। কৃষি উৎপাদননির্ভর করে বহু বিষয়ের ওপর উন্নত বীজ, সেচ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, জমির পরিচর্যা, আবহাওয়া এবং কৃষকের দক্ষতা। শুধু ন্যানো সার ব্যবহার করলেই সব সমস্যা দূর হবে না। এটিকে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
এখানে নীতিমালা ও মান নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে জরুরি বিষয়। ন্যানো উপাদান প্রচলিত উপাদানের চেয়ে ভিন্ন আচরণ করে। তাই উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, লেবেলিং, প্রয়োগমাত্রা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দেশে সার আইন থাকলেও ন্যানো সারের জন্য আলাদা মানদণ্ড ও পরীক্ষাগার সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এটি দ্রুত গড়ে তুলতে হবে। না হলে নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্য বাজারে ঢুকে কৃষককে বিভ্রান্ত করতে পারে।
কৃষক প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত সার কৃষকরা বস্তা ধরে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। কিন্তু ন্যানো সার অনেক সময় তরল বা স্প্রে আকারে আসে, যা নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়। তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী ও সচেতনতা কর্মসূচি নিতে হবে।
মূল্য ও প্রাপ্যতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যদি শুধু বড় কৃষক বা বাণিজ্যিক খামারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর সামাজিক সুফল সীমিত হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের হাতে সাশ্রয়ী দামে ন্যানো সার পৌঁছাতে হবে। স্থানীয় উৎপাদন, সরকারি সহায়তা এবং সুষ্ঠু বিপণনব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তবে ন্যানো সারের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জৈবসারের গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না। গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, পোল্ট্রি লিটার ও বায়োফার্টিলাইজার মাটির জৈবগুণ, পানি ধারণক্ষমতা এবং অণুজীবের কার্যক্রম বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৃষির জন্য রাসায়নিক সার, ন্যানো সার ও জৈবসারের সমন্বিত ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। প্রথমত, ধান, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, তেলবীজ ও সবজিসহ প্রধান ফসলে বিভিন্ন অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় মানদণ্ড ও নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, দেশীয় গবেষণা ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, ন্যানো সারকে জলবায়ু সহনশীল কৃষি কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিজমি কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহ বাড়ছে। উৎপাদন খরচও বাড়ছে। পুরোনো কৃষিপদ্ধতিতে শুধু বেশি সার ব্যবহার করে আর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এখন প্রয়োজন দক্ষতা, নির্ভুলতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। ন্যানো ফার্টিলাইজার সেই পরিবর্তনের প্রতীক।
প্রশ্ন এখন একটাই বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে, নাকি পিছিয়ে থাকবে? সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজই। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং কৃষকবান্ধব বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যানো ফার্টিলাইজার হতে পারে বাংলাদেশের কৃষির নতুন মাইলফলক। টেকসই, স্মার্ট এবং খাদ্যনিরাপদ ভবিষ্যতের পথে এটি হতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ড. মো. আল-মামুন
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট