ঢাকা রোববার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা

নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা

আসর গড়িয়েছে অনেক সময় হলো। সূর্য ডুবু ডুবু প্রায়। চলছে দিনরাতের আলো-আঁধারির খেলা। জনজীবনে নেমে এসেছে ভীষণ ব্যস্ততা। সবার নিজ গন্তব্যে ফেরার তাগাদা। ঠিক এ মুহূর্তের কথা। পাশের গলি থেকে যৌথকণ্ঠে ভেসে এলো এ আওয়াজ- ‘আমার আল্লাহ-নবীজির নাম...’। তাকালাম ঘাড় বাঁকিয়ে। নজরে পড়ল চারজন বৃদ্ধের অভিনব ভঙিমা। দুজন দাঁড়িয়ে আর দুজন শুয়ে শুয়ে এগোয় সামনে। মুখে ওই একই ধ্বনি। জায়গাটি অফিসপাড়া পল্টনের। নানা রঙের নানান মানুষের আনাগোনা এখানে। কেউ হেঁটে, কেউ বা দাঁড়িয়ে থাকে- নিজ কর্ম ব্যস্ততা কিংবা অন্য কোনো কারণে।

এগোলাম ওদের চারজনের কাছে। একদম কাছাকাছি হতেই চারটি হাত আমার সামনে মেলে ধরল ওদের দুজন। বুঝতে বাকি নেই- এটা ভিক্ষাবৃত্তি।

পকেট থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করে দিতে দেরি, ওদের একজনের তুলে নিতে বিলম্ব হলো না। অবাক হলাম- এদের তো টাকাটা দেওয়ার জন্যই বের করেছিলাম, এত তাড়া কীসের? ব্যাপারটি পাশের ফুটপাতের শরবত বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম। সে একে একে অনেক কথা শোনাল ওদের সম্বন্ধে। যার একটিও কারোর বিশ্বাস হওয়ার কথা নয়। তেমনি আমারও হলো না।

বিষয়টির প্রতি ভীষণ কৌতূহল জাগল। জানতে ইচ্ছে হলো পুরো বৃত্তান্ত। তাই পিছু নিলাম ওদের। দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে ফকিরাপুল এবং সবশেষে মতিঝিল কলোনীর একটি বাসায় এসে শেষ হয় ওদের ভিক্ষাকর্ম। ঝুপড়ির মতো এ বাসায় শুয়ে শুয়ে পথচলা ভিখারিদ্বয় দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকে। জানালার ফাঁক দিয়ে মেলে ধরি চোখ দুটো। ভেতরের কৃতকর্মে বেশ অবাক হই। সারাবেলার ভিক্ষা-অর্জিত অর্থের ভাগাভাগি হয় ওদের মধ্যে। সঙ্গে যুক্ত হয় মাঝবয়সী আরও দুজন।

যারা আগ থেকেই বাসায় অবস্থান করছিল। এদের সঙ্গে এ দলটির চুক্তি আছে। আগামীকাল পালা এ দুজনের। এদের সাবধান করা হলো- ‘নঈমরা যদি আঙ্গো এলাকায় আহে, তাইলে অগো তাড়াই দিবি।’

নগরীর পথেপ্রান্তরে এ রকম ঘটনা ঘটছে অহরহ। রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ছে নিত্যদিন। দিনের পর দিন এদের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে অতিমাত্রায়। ছেঁড়া-ফাটা জামা, হাতে পাকা বাঁশের লাঠি, কুঁজো-খুড়িয়ে কিংবা শুয়ে শুয়ে পথচলা, লোক দেখে গলার স্বর পাল্টে অনুনয়-বিনয় করাসহ নানান ভঙিমায় নানা বয়সীকে দেখা যায় এমন ভিক্ষাবৃত্তিতে। নেই এতে পুরুষ-মহিলার তারতম্য। রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় মসজিদের সামনেও মা-ছেলে কিংবা বাপ-ছেলে সাজিয়ে অথবা মেয়ের বিয়ে বা মায়ের গুরুতর অসুস্থতার কথা বলে ভিক্ষা করতে দেখা যায় এসব ভিখারিকে।

শুধু এ যুগে নয়, রাসুল (সা.)-এর যুগেও এমন ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল একগোষ্ঠী। যা হাদিসসহ ধর্মীয় বেশ কিছু গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া বাংলাসাহিত্যের কবি শেখ হাবিবুর রহমানের এ কবিতাটি আমাদের কাছে সুপ্রসিদ্ধ- ‘তিনদিন হতে খাইতে না পাই, নাই কিছু মোর ঘরে,/দারা পরিবার বাড়িতে আমার উপোস করিয়া মরে,/নাহি পাই কাজ, তাই ত্যাজি লাজ বেড়াই ভিক্ষা করি,/হে দয়াল নবী! দাও কিছু মোরে, নহিলে পরাণে মরি...।’ রাসুল (সা.)-এর দরবারে এক ভিখারির ভিক্ষা চাওয়া ও রাসুল (সা.)-কর্তৃক তাকে শ্রমের গুরুত্ব বোঝানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রচিত ‘নবীর শিক্ষা’ নামক এ কবিতা। ভিক্ষা চাওয়ার পর রাসুল (সা.) লোকটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার কী সম্বল আছে?’ লোকটি তার একমাত্র সহায় কম্বল এনে দিলে তিনি তা বিক্রি করেন। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে কুঠার কিনে হাতল লাগিয়ে বললেন, ‘যাও কাঠ কেটে খাও, দেখ খোদা করে কী যে।’ বনের কাঠ কেটে বিক্রি করে সেদিন থেকেই ভিখারির জীবনে আসে আমূল পরিবর্তন। সঙ্গে বদলে যায় তার সামাজিক মান-মর্যাদা।

ইসলামের অন্যতম ফরজ (জাকাত) আদায় করে না সমাজের সেসব বিত্তবান, যারা অনর্থক অর্থ ব্যয়ে মশগুল কিংবা করলেও যৎসামান্য। অনেকে আবার পুরো অস্বীকার করেই বসে এ ফরজ কাজ। যার ফলে নিজের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এ ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতে হয় এসব লোকের। সর্বোপরি আলোচ্য কবিতায় রাসুল (সা.)-এর দেওয়া শিক্ষা যদি প্রতিটি ভিখারি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে, তাহলে দুমুঠো অন্নের খোঁজে কাউকে আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে হবে না। মানবিক মানও বহাল থাকবে নিঃসন্দেহে।

নবীর শিক্ষা,ভিক্ষা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত