ঢাকা সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধ্বংসলীলা : উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্ভোগ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধ্বংসলীলা : উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্ভোগ

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত পঞ্চম বছরে পড়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধ চলছে, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাত অব্যাহত, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সিরিয়ায় সহিংসতা চলমান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে, যা স্ট্রেইট অব হরমুজ দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশ ছায়াযুদ্ধ ও উত্তেজনায় জড়িয়ে আছে।

এসব বড় শক্তিধর দেশের সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা (যেমন আইএমএফ ও ইউএনডিপি) বলছে, যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সেই দেশগুলো, যাদের আন্তর্জাতিক মহলে কণ্ঠস্বর খুবই দুর্বল। উন্নত দেশগুলো যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও, ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো দশকের পর দশক পিছিয়ে পড়ে।

যুদ্ধ সরাসরি কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দেয়। আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কাঁচামালের আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে। ফলে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়, কর্মসংস্থান কমে এবং অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের সময় সরকারি ব্যয় সামরিক খাতে বহুগুণ বেড়ে যায়, অথচ রাজস্ব আয় কমে। এই ঘাটতি পূরণে অনেক দেশ মুদ্রা ছাপানোর পথ বেছে নেয়, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি চরম দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। কালোবাজারি বেড়ে যায় এবং জনগণের সারাজীবনের সঞ্চয় নিমেষে নিঃশেষ হয়ে যায়।

যুদ্ধের খরচ মেটাতে অনেক ছোট দেশ উচ্চ সুদে বিদেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ১১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ঋণ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ চলে যায় সুদ পরিশোধে, ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত থাকে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত মেনে নিতে হয়, যা জাতীয় নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে।

ফলে দেশগুলো বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ভৌত অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত, বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতের ধস, মানবসম্পদের ক্ষতি (মৃত্যু, আহত, শরণার্থী)। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য অবরোধ।

সাম্প্রতিক আইএমএফের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নআয়ের দেশগুলো, যেখানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।

পরিশেষে, আধুনিক যুদ্ধগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো বৈশ্বিক বিপর্যয়ের অংশ, যেখানে উন্নত দেশগুলোর সংঘাতের বলির পাঁঠা হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাদের সীমিত সম্পদ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাবে এ ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

শান্তি হলো যেকোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল শর্ত। শান্তি ছাড়া স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি রক্ষায় এগিয়ে আসা। অন্যথায় ভবিষ্যতে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে অনেক দেশের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে, যা সমগ্র বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত