ঢাকা সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পুলিশবাহিনীর পেশাদারত্ব সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকাই বাঞ্ছনীয়

পুলিশবাহিনীর পেশাদারত্ব সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকাই বাঞ্ছনীয়

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার প্রধান কারিগর হলো তার পুলিশবাহিনী। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের ভূমিকা শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে পুলিশবাহিনীর ‘পেশাদারত্ব’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য পেশাদারত্ব কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটিই হলো তাদের অস্তিত্বের মূলভিত্তি। তাই যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারত্ব বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

পুলিশের পেশাদারত্ব বলতে মূলত বোঝায়- আইনের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, নিরপেক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ দক্ষতা। যখন একজন পুলিশ সদস্য ইউনিফর্ম গায়ে দেন, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শ গৌণ হয়ে যায়; তার প্রধান পরিচয় হয় তিনি ‘জনগণের সেবক’। পেশাদারত্বের মূল কথা হলো, অপরাধীর পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করা। পুলিশবাহিনীর পেশাদারত্বের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো অতি-রাজনীতিকরণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশবাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। যখন বাহিনীর নিয়োগ, পদায়ন কিংবা পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়, তখন পেশাদারত্ব মুখ থুবড়ে পড়ে। একজন পুলিশ সদস্য যখন অনুভব করেন যে তার ক্যারিয়ারের উন্নতি আইনের শাসনের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তখন তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সাহস হারান। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়। পুলিশকে কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের এবং জনগণের বাহিনী হিসেবে কাজ করতে হবে।

পুলিশের সাফল্যের মাপকাঠি হলো জনআস্থা। সাধারণ মানুষ যখন বিপদে পড়ে পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায় না, তখনই বুঝতে হবে বাহিনীর পেশাদারত্ব সঠিক পথে আছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝেমধ্যেই ক্ষমতার অপব্যবহার, হেফাজতে নির্যাতন বা বিনা কারণে সাধারণ মানুষকে হেনস্তার খবর শিরোনাম হয়। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। পেশাদারত্বের দাবি হলো- একজন কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রত্যেকের আচরণ হবে মার্জিত এবং আইনানুগ। শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘ন্যূনতম বল প্রয়োগ’ (Minimum Force)-এর নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত।

পেশাদারত্ব শুধু সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত প্রযুক্তি। পরিবর্তিত অপরাধ জগতের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে সাইবার ক্রাইম, ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণে পুলিশকে আরও দক্ষ হতে হবে। পাশাপাশি, পুলিশ সদস্যদের কর্মঘণ্টা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করাও জরুরি। একজন অবসাদগ্রস্ত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সদস্যের কাছ থেকে পেশাদার আচরণ আশা করা কঠিন। তাই কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সভ্য সমাজের দর্পণ হলো তার পুলিশবাহিনী। পুলিশ যদি স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবেই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। সব কিছুর ঊর্ধ্বে দেশপ্রেম এবং পেশাদারত্বকে স্থান দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইউনিফর্মের মর্যাদা রক্ষার অর্থ হলো সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করা। রাজনৈতিক চাপ কিংবা প্রলোভন সাময়িক হতে পারে; কিন্তু পেশাদারত্বের মাধ্যমে অর্জিত সম্মান চিরস্থায়ী। একটি জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব এবং পেশাদার পুলিশবাহিনী গড়ে তোলা শুধু প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, এটি আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত। পেশাদারত্ব বজায় থাকুক সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে- এটাই আজ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত