প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ মে, ২০২৬
দূরারোগ্য ক্যান্সার- শব্দ দুটির সম্মিলন কোনো আশাব্যঞ্জক অর্থ বহন করে না। বরং এই শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহু পরিবারের জীবনে নেমে আসে এক নীরব ধস। ক্যান্সার শুধু একটি রোগ নয়; এটি অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। রোগটি শনাক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসার নয়, বরং- এই চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য রোগীর আদৌ আছে কি না। ফলে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই সাধারণ মানুষের চিকিৎসার চেয়ে টাকার সঙ্গে অসম যুদ্ধে পরিণত হয়। International Agency for Research on Cancer-Gi GLOBOCAN 2022 অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। উদ্বেগজনকভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়ছে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সংকট হলো এর বিপুল ব্যয়। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়ের ব্যবধান এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি পর্যায়ে National Institute of Cancer Research and Hospital -এ তুলনামূলকভাবে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া যায়। সেখানে রেডিওথেরাপির সম্পূর্ণ কোর্স সাধারণত প্রায় ১২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। কেমোথেরাপির একটি সাইকেলের খরচ প্রায় ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে থাকে।
তবে রোগীর অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সীমিত সুবিধার কারণে অনেকেই সম্পূর্ণ চিকিৎসা সেখানে গ্রহণ করতে পারেন না। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসার ব্যয় বহুগুণ বেশি। রেডিওথেরাপির খরচ প্রায় ১ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, কেমোথেরাপির প্রতিটি সাইকেল ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সার্জারির ক্ষেত্রে খরচ সাধারণত ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলেও জটিল ক্ষেত্রে এটি আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, হাসপাতাল ফি এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ খরচ, যা মিলিয়ে পুরো চিকিৎসা অনেক সময় কয়েক লক্ষ থেকে বহু লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ে গিয়ে পৌঁছে যায়। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরু করেও মাঝপথে আর্থিক সংকটে পড়ে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা পুরোপুরি অসম্ভব নয়, তবে এখনও তা সর্বজনীনভাবে সহজ বা সাশ্রয়ীও হয়নি। প্রাথমিক ও কিছু মাঝারি পর্যায়ের চিকিৎসা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করা সম্ভব হলেও উন্নত প্রযুক্তি, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা চিকিৎসাকে অনেক সময় জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় বাস্তবতা হলো- অধিকাংশ ব্যয় ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়। World Bank -এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ স্বাস্থ্য ব্যয় মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে এই ব্যয় একটি পরিবারের আর্থিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণভাবে নড়িয়ে দেয় এবং অনেককে দারিদ্র্যের ফাঁদে ঠেলে দেয়। চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। দেশে বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল ও অনকোলজিস্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। চিকিৎসা ব্যবস্থার বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষকে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিতে হয়, যা অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তির কারণ হয়। যদিও Ministry of Health and Family Welfare Bangladesh বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, বাস্তবায়নের ধীরগতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সচেতনতার অভাব এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার প্রবণতা। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগী ক্যান্সারের তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য আসেন। প্রাথমিক লক্ষণ- যেমন দীর্ঘস্থায়ী কাশি, অস্বাভাবিক গুটি, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক রক্তপাত- অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কুসংস্কার ও ভয়ও সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর World Cancer Day ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস পালিত হয়, ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। নানা প্রচারণা ও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্?যাপিত হলেও বাস্তবতা হলো- সচেতনতার এই বার্তা এখনও সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি, আর চিকিৎসাসেবা এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
স্ক্রিনিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার কিংবা মুখগহ্বর ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও দেশে নিয়মিত ও ব্যাপক স্ক্রিনিং কার্যক্রম এখনও যথেষ্ট বিস্তৃত নয়। ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে, যখন চিকিৎসা আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সংকট আরও গভীর। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সুবিধা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে মানুষ অনেক দেরিতে চিকিৎসা শুরু করেন। শহরে আসার খরচ এবং কর্মহানি তাদের সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তোলে।
সরকারি সহায়তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। Ministry of Social Welfare Bangladesh ক্যান্সার রোগীদের এককালীন আর্থিক সহায়তা দিলেও বর্তমান চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় তা খুবই সীমিত। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রথমত, ক্যান্সার চিকিৎসায় সরকারি ভর্তুকি বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ জরুরি। দ্বিতীয়ত, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যাতে রোগীদের রাজধানীমুখী হতে না হয়। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষিত অনকোলজিস্ট ও চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে একটি কার্যকর ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থা চালু করা। এই বিমা ব্যবস্থার আওতায় ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল রোগ অন্তর্ভুক্ত থাকলে সাধারণ মানুষ আর্থিক বিপর্যয় থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাবে। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসুরক্ষা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ সচেতনতা বাড়াতে আবশ্যক- জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা, তামাক ও ক্ষতিকর খাদ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ, গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করা এবং গবেষণা জোরদার করা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ক্যান্সার শুধু একটি রোগ নয়; এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সামাজিক সচেতনতার সম্মিলিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে- তাদের জীবন, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ দিয়ে। তাই এখনই সময় বাস্তবমুখী ও মানবিক নীতিনির্ধারণের। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা, বিস্তৃত চিকিৎসা অবকাঠামো, কার্যকর স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ই পারে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম থেকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারে রূপান্তরিত করতে।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়