ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সম্ভাবনাময় সমাজবিজ্ঞান

নুসরাত সুলতানা
সম্ভাবনাময় সমাজবিজ্ঞান

প্রায় অনেকের প্রশ্ন থাকে সমাজবিজ্ঞান পড়ে কি হবে? অথচ আমরা কি জানি মেডিকেল স্টুডেন্টসহ সাইন্সের অনেক ডিপার্টমেন্টে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হয়। কারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সমাজের কাঠামো এসব না জেনে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়। আর শারীরিক ত্রুটি দূর করতে ঔষুধের পাশাপাশি মানুষের মন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা খেয়াল রেখে রোগীদের সমস্যার সমাধান দিতে হয় তাই মেডিকেল স্টুডেন্টদেরও পড়ানো হয় সমাজবিজ্ঞান।

সমাজবিজ্ঞান বিকাশ লাভ করেছে শিল্পায়নের পর যখন দেখেছে শুধু প্রযুক্তির উদ্ভবন সমাজে উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। যেহেতু সব আধুনিক উদ্ভাবন সামাজিক জীব মানুষের জন্য তাই আমাদের সুন্দর সুশৃঙ্খল জীবন ধারণের জন্য সমাজবিজ্ঞান জানা প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানের বিস্তার বিকাশের ফলে প্রায় ২০০ বছর ধরে আলাদা বিভাগ হিসেবে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হয়ে আসছে।

অন্যদিকে ক্যারিয়ারের কথা যদি চিন্তা করি তাহলে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের স্নাতকদের সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থায় চাকরির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বিসিএস, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া সামাজিক উন্নয়ন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, পরামর্শক এবং ডাটা অ্যানালিস্ট হিসেবেও কাজের সুযোগ রয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, ইউনেসকো, বিশ্বব্যাংক, আইএলও এর মতো সংস্থাগুলোতে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রোগ্রাম অফিসার, এবং পলিসি অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

সামাজিক গবেষণায় সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিভাগ থেকে এগিয়ে। সমাজবিজ্ঞানে প্রথম বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা করতে হবে তা শেখানো হয়। এতে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সমাজের সমস্যার সমাধানে, অপরাধী সনাক্তকরণে, সমাজের উন্নয়ন কীভাবে করতে হবে তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করে থাকে। আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, আচরণ, সামাজিক কাঠামো, সমাজ পরিচালনা নিয়ে বিস্তার জ্ঞান লাভ করে বলে যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালায় সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সাফল্য লাভ করে। তাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থানের কার্যক্রমে, গবেষণা প্রকল্পে লাখের উপরে বেতন নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতেও সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন। চীনের কথাই ধরা যাক, তারা তাদের জনসংখ্যা নীতি ও সামাজিক উন্নয়নে সমাজবিজ্ঞানীদের তত্ত্ব অনুসরণ করেন এক সন্তান নীতি প্রণয়ন করেছে। পরবর্তীতে সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে জনসংখ্যা তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবন করতে পেরে জনসংখ্যা নীতিতে পরিবর্তন আনে। শুধু চীন না উন্নত অনেক দেশ তাদের সামাজিক নীতিমালা নির্ধারণে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার উপর নির্ভরশীল হয়। তাই বিদেশে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুবিধা ও অনেক এবং শিক্ষার্থীরা চাইলে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে শিক্ষার্থীরা যেতে পারে। এছাড়া দেশেও বুয়েটের Urban & Regional Planning (URP) ডিপার্টমেন্টে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মাস্টার্সে ফন্ডসহ থিসিস করার সুযোগ রয়েছে, যেখানে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অনেক বিভাগের সুযোগ থাকে না।

যদিও বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক প্রয়োগ ও গুরুত্ব কম দেখা যায় কিন্তু সঠিক নগর পরিকল্পনায় সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বিকল্প নেই। সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পারিবারিক বন্ধন, গ্রামের উন্নয়ন, শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য দূর করা সম্ভব।

যে বিভাগকে আমরা অবহেলা করছি, তার তাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানে গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ, গবেষণার ফলাফল অনুসারে কাজ করা এবং শিক্ষা জীবন থেকে সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান লাভে সবাইকে উৎসাহিত করা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা। ফলে বিষয়ভিত্তিক কর্মক্ষেত্র সুযোগ সৃষ্টি হবে, বেকারত্ব হ্রাস পাবে, তাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে লাগবে এবং দেশে উন্নতি সাধন হবে। তাই সমাজবিজ্ঞানকে উপেক্ষা না করে এর বর্তমান ও ভবিষ্যত গুরুত্বের কথা চিন্তা করা এবং এর তাত্ত্বিক জ্ঞানকে কাজে লাগানো।

নুসরাত সুলতানা

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত