ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশের সামনে জলবায়ুর ভয়ংকর ভবিষ্যৎ

মো. শামীম মিয়া
বাংলাদেশের সামনে জলবায়ুর ভয়ংকর ভবিষ্যৎ

জ্যৈষ্ঠের গরম বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। এই ভূখণ্ডের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরেই খরতাপ, লু হাওয়া আর ঘামে ভেজা দুপুরের সঙ্গে বসবাস করে আসছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবারকার গরম শুধু তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে না, মানুষের সহ্যক্ষমতাকেও ভেঙে দিচ্ছে। বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা, ভ্যাপসা আবহাওয়া, দমবন্ধ করা গুমোট পরিবেশ আর হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির অস্বাভাবিক আচরণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে- বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এখন আর গরমকে শুধু ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই গরম শুধু অস্বস্তি তৈরি করছে না; এটি মানুষের শরীর, শ্রম, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। আজ বাংলাদেশের রাস্তায় বের হলেই বোঝা যায়, গরম কতটা নির্মম হয়ে উঠেছে। সকাল গড়ানোর আগেই শহরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। দুপুরে রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় যেন আগুনের চুল্লির ভেতর দিয়ে চলা হচ্ছে।

থার্মোমিটারে হয়তো ৩৭ বা ৩৮ ডিগ্রি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে মানুষের শরীর সেই তাপমাত্রাকে ৪৪ বা ৪৫ ডিগ্রির মতো অনুভব করছে। কারণ বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। ঘাম ঝরছে, কিন্তু শরীর ঠান্ডা হচ্ছে না। ফলে মানুষ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, মাথা ঘুরছে, শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। যে রিকশাচালক সারাদিন রোদে প্যাডেল ঘোরাচ্ছেন, যে নির্মাণশ্রমিক খোলা আকাশের নিচে কাজ করছেন, যে দিনমজুর ইট বহন করছেন কিংবা যে হকার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে জীবিকার লড়াই করছেন- তাদের জন্য এই গরম নিছক ঋতু নয়, এটি প্রতিদিনের যুদ্ধ। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে এই শ্রমজীবী মানুষের ঘামের উপর। কিন্তু সেই মানুষগুলোর জন্য আমাদের নগরব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি কতটা মানবিক? প্রচণ্ড গরমে কাজের সময় কমানোর কোনো কার্যকর নীতি নেই, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা নেই, পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থাও নেই। ফলে মানুষ কাজ না করলে যেমন না খেয়ে থাকার ভয়, তেমনি কাজ করলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি। এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের উন্নয়নের ভেতরের ভয়ংকর বৈষম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

শুধু শ্রমজীবী মানুষ নয়, শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, বৃদ্ধরা ঝুঁকিতে পড়ছেন, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের সমস্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য খাত এখনো এই নতুন জলবায়ুগত সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিস্থিতি কোনো সাময়িক ব্যতিক্রম নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, আর দক্ষিণ এশিয়া তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। বাংলাদেশ সেই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতেই অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়বে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, ভয়াবহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে এখন আমরা সেই বাস্তবতাই দেখছি। একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে হঠাৎ কালবৈশাখী, বজ্রপাত কিংবা অস্বাভাবিক বর্ষণ- প্রকৃতি যেন তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি শুধুই প্রকৃতির সৃষ্টি? উত্তর হলো- না। এর বড় অংশ মানুষের তৈরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের শহরগুলো আজ নিজেরাই নিজেদের জন্য গরমের ফাঁদ তৈরি করেছে। ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় চলে যাচ্ছে। কারণ শহরের গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে, খাল-বিল ও জলাধার ভরাট করা হয়েছে, খোলা জায়গা ধ্বংস করা হয়েছে। চারদিকে শুধু কংক্রিটের দালান আর উত্তপ্ত রাস্তা। একসময় শহরে বড় বড় গাছ ছিল, পুকুর ছিল, খোলা মাঠ ছিল। এখন সেখানে শপিংমল, বহুতল ভবন আর কংক্রিটের দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে শহরে বাতাস চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সূর্যের তাপ কংক্রিটে আটকে থাকে এবং রাতেও সেই তাপ বের হতে পারে না। এ কারণেই শহরগুলো ‘হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের নামে আমরা এমন এক নগরব্যবস্থা তৈরি করেছি, যা মানুষকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তুলছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এখনও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমরা উন্নয়ন বলতে বুঝি বড় রাস্তা, উড়ালসড়ক, দালান আর মেগা প্রকল্প। কিন্তু একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, মানুষ সেখানে কতটা স্বস্তিতে বাঁচতে পারছে- সেই প্রশ্ন খুব কমই গুরুত্ব পায়। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো সভ্যতা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাস বারবার সেটাই প্রমাণ করেছে। অথচ আমরা সেই একই ভুল করে চলেছি। নদী দখল করছি, গাছ কাটছি, জলাধার ভরাট করছি, পাহাড় ধ্বংস করছি- তারপর আবার প্রকৃতির প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হচ্ছি। এই গরম শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি অর্থনৈতিক সংকটও। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা শ্রমঘণ্টা কমিয়ে দেয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ খোলা পরিবেশে কাজ করেন, সেখানে তাপপ্রবাহ সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলছে। কৃষিক্ষেত্রও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অতিরিক্ত গরমে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে, মাটির আর্দ্রতা নষ্ট হতে পারে, সেচব্যব¯’ার উপর চাপ বাড়তে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলবে। দুঃখজনকভাবে, আমরা এখনও এই সংকটকে প্রয়োজনীয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি না। অনেকেই মনে করেন, গরম তো প্রতি বছরই পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আগের গরম আর এখনকার গরম এক নয়। এখনকার গরমের পেছনে আছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, পরিবেশ ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের সম্মিলিত প্রভাব।

সরকারের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শহরাঞ্চলে বড় পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে গাছ লাগানো নয়, সেগুলো সংরক্ষণেরও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাল-বিল ও জলাধার রক্ষা করতে হবে। কারণ পানি ও সবুজ পরিবেশই শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, শ্রমজীবী মানুষের জন্য ‘হিট সেফটি পলিসি’ চালু করা প্রয়োজন। প্রচণ্ড গরমে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বিশ্রামের সুযোগ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতকে প্রস্তুত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে হিট স্ট্রোক ও গরমজনিত রোগ মোকাবিলার বিশেষ ইউনিট প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা এখনও পরিবেশকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখি। অথচ পরিবেশ ধ্বংস মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ধ্বংস। আজকের এই গুমোট গরম আসলে একটি কঠিন সতর্কবার্তা। প্রকৃতি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে- সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনো যদি আমরা অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ু সংকটকে অবহেলা করি, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।

হয়তো এমন এক সময় আসবে, যখন গ্রীষ্মমানেই হবে দীর্ঘ স্বাস্থ্যঝুঁকি, শ্রমহানি, খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মৌসুম। তখন শুধু এসি-নির্ভর কিছু মানুষ নয়, পুরো সমাজই সংকটে পড়বে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ধনী-গরিব কাউকেই শেষ পর্যন্ত রেহাই দেয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নেয় না; প্রকৃতি শুধু ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। আর সেই ভারসাম্যহীনতার মূল্য মানুষকেই দিতে হয়। অতএব, এই অসহনীয় গরমকে সাময়িক দুর্ভোগ ভেবে ভুল করলে চলবে না। এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের এক ভয়ংকর পূর্বাভাস। এই সংকেত বুঝতে না পারলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন বাস্তবতা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়- আমরা কি কংক্রিটের উত্তপ্ত নগরে ধীরে ধীরে অসুস্থ এক সমাজে পরিণত হব, নাকি পরিবেশবান্ধব, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথে হাঁটব? কারণ আজকের গরম শুধু আবহাওয়ার খবর নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

মো. শামীম মিয়া

শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত