প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ জুন, ২০২৬
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসি সিস্টেমের ত্রুটি, গ্যাস লিকেজের ফলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু বেদনাদায়কই নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও চরম অব্যবস্থাপনার এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। যে হাসপাতাল নবজাতকের জন্য হওয়া উচিত ছিল জীবনের নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে নিদারুণ অবহেলার শিকার হয়ে পৃথিবীর আলো দেখার পরপরই তাদের ৬ জনের প্রাণ ঝরে গেল। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পুঞ্জীভূত গাফিলতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের যথাযথ নজরদারির অভাবেরই ফল।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণ সমতুল্য একটি সংবেদনশীল ওয়ার্ডে মধ্যরাতে প্রায় দুই ঘণ্টা এসি বন্ধ ছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসি বন্ধ থাকার ওই সময়ে কক্ষটিতে কোনো বিকল্প ভেনটিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংবেদনশীল ওয়ার্ড, যেখানে নবজাতকরা চিকিৎসাধীন থাকে, সেখানে বিকল্প কোনো ভেনটিলেশন ব্যবস্থা না থাকা এককথায় চরম অপরাধমূলক উদাসীনতা। এসি পুনরায় চালু করার পর গ্যাস লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যদি ‘সাফোকেশন’ বা শ্বাসরোধের পরিস্থিতি শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তবে এর দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।
এর চেয়েও বড় বিস্ময় ও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতাল ভবনের উপরের একটি তলায় রুটির কারখানার সন্ধান মেলা। একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ভবনের ভেতরে, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ও নবজাতক চিকিৎসাধীন থাকে, সেখানে কার অনুমোদন বা প্রশ্রয়ে এমন বিপজ্জনক কারখানা সচল ছিল, তা এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। একটি স্পর্শকাতর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন কারখানার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, হাসপাতাল পরিচালনায় সুরক্ষার নিয়মকানুনকে কতটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। আমরা মনে করি, নিয়মিত তদারকি থাকলে কোনো হাসপাতালেই এমন অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলতে পারে না। এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্তের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩ জুন নির্ধারণ করেছে যাতে সন্তানহারা মায়েদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা যায়। আমরা আশা করি, এ তদন্ত কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই সময় দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের, যেন দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ, এনআইসিইউ এবং পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের সেন্ট্রাল এসি ও ভেনটিলেশন ব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে অডিট করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে হাসপাতাল ভবনে অন্য কোনো বাণিজ্যিক বা ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলছে কিনা, তাও কঠোরভাবে তদারকি করা জরুরি। যদিও ছয়টি পরিবারের শূন্য কোল আর কখনও পূর্ণ হবে না; কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের (যা অবহেলাজনিত মৃত্যু) পেছনে দায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা, টেকনিশিয়ান এবং তদারকিতে ব্যর্থ সরকারি পরিদর্শকদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, চিকিৎসা নিতে এসে অবহেলার বলি হওয়ার এই ধারা কখনোই বন্ধ হবে না। সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।