প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জুন, ২০২৬
শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই অনেক আগে থেকেই। আজকাল শ্রেণিবিভাজন সেরকম প্রকট আকারে নজরে না আসলেও, অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ গভীরভাবে তা এখনও বর্তমান। বাংলাদেশের উন্নয়নশীল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। রাষ্ট্রের রাজস্ব, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই শ্রেণির অবদান অনস্বীকার্য।
অথচ আজকের এই চলমান আধুনিক যুগের বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি চাপের সম্মুখীন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী। একদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে আয়ের স্থবিরতা। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মধ্যবিত্তের জীবন যেন অবিরাম সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। একসময় প্রচলিত ছিল, একটি দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই তার অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি। এই শ্রেণির মানুষেরাই স্বপ্ন দেখে, পরিশ্রম করে, সন্তানদের শিক্ষিত করে, টেক্স দেয় এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাকা সচল রাখে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই যেন সবচেয়ে বড় নিরব সংকটের মুখোমুখি। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ বাড়ছে, অথচ এই সংকটের কোনো দৃশ্যমান সমাধান সামনে আসছে না। ফলে মধ্যবিত্তের জীবন আজ যেন এক নীরব সংগ্রাম। গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজি প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যাতায়াত ও বাসাভাড়ার খরচ। চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় খরচের ক্ষেত্রেও বারবার হিসাব করতে হচ্ছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে অধিকাংশ চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের পেশাজীবীদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে মাসের শেষে আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, তারা দরিদ্র নয় বলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আসে না, আবার ধনীও নয় যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সহজে সহ্য করতে পারবে। ফলে তারা এক ধরনের অদৃশ্য সংকটের মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছে। সমাজে তাদের বাহ্যিক অবস্থান অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে তারা প্রতিদিন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছেন। একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবীর মাসিক বেতন হয়তো নির্দিষ্ট।
কিন্তু বাজারের মূল্যবৃদ্ধি কোনো নির্দিষ্ট সীমা মানে না। যে পরিবার কয়েক বছর আগে মাসিক আয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চলতে পারতেন, আজ সেই একই আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে যেখানে কিছু অর্থ সঞ্চয় করার পথ ছিল, এখন সেখানে মাসের শেষে হাতে কিছুই থাকে না। অনেক পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে, কেউ কেউ আবার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। মধ্যবিত্তের জীবন থেকে ধীরে ধীরে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়, এসব বিষয় একসময় মধ্যবিত্তের পরিকল্পনার অংশ ছিল। এখন সেগুলো অনেকের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিবারের কোনো সদস্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয় মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঋণ নিতে বা সম্পদ বিক্রি করতেও বাধ্য হতে হয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে অভিভাবকদের ব্যয় বেড়েই চলেছে।
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, কোচিং, বইপত্র, প্রাযৌক্তিক সরঞ্জাম এবং যাতায়াত ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে শিক্ষাকে বিনিয়োগের বদলে অনেক সময় ব্যয়ের বোঝা হিসেবেও দেখতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার।
এদিকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুবই সংকীর্ণ। উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। আবার যারা চাকরি পাচ্ছেন, তাদের অনেকের আয় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল। এর ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মধ্যবিত্তের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও। প্রতিনিয়ত ব্যয় মেটানোর চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
পরিবারে উদ্বেগ, দাম্পত্য কলহ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যাও অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপে বাড়ছে। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব শুধু বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের মনোজগৎ ও সামাজিক সম্পর্কেও গভীর ছাপ ফেলে। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব অবশ্যই একটি কারণ। তবে এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলার অসংগতি, অসাধু মজুতদারি ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতিও মূল্যবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়তে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে ভোক্তারা ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ আবশ্যক। বাজার তদারকি জোরদার করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মজুরি কাঠামোর বাস্তবসম্মত সমন্বয় এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও কাঠামো এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন, যাতে সংকটাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিও কিছুটা সুরক্ষা পায়। কারণ মধ্যবিত্তই ভোগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। এই শ্রেণি যদি ক্রমাগত আর্থিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের সাধারণ মানুষ তার সুফল বাস্তবে অনুভব করবে। মধ্যবিত্তের ঘরে যদি স্বস্তি না ফেরে, যদি মাসের শেষে হিসাবের খাতা হতাশা, হাহাকারে ভরে থাকে, তবে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ