ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা : বাস্তবতা, সংকট ও করণীয়

এম মহাসিন মিয়া
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা : বাস্তবতা, সংকট ও করণীয়

নয়নাভিরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ তেমনি অনন্য ভূপ্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের অঞ্চল। পাহাড়, অরণ্য, নদী এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী হলেও জাতীয় জীবনের সামগ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই এই অঞ্চলের মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, উন্নয়ন, সংকট ও সম্ভাবনা জাতীয় আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়।

গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। এর মূল দায়িত্ব হলো সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থকে ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করা। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কখনোই কোনো অঞ্চল, জনগোষ্ঠী বা বিষয়কে অবহেলা করতে পারে না। বরং দেশের প্রতিটি প্রান্তের বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা গণমাধ্যমের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়গুলোও জাতীয় গণমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

?তবে বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সংবাদ কাভারেজের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, জাতীয় গণমাধ্যম কি এই অঞ্চলের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করছে? যদি না করে, তবে এর পেছনের কারণ কী? তথ্যপ্রাপ্তি ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি দুর্গম ও পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় এখানে তথ্য সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। অনেক এলাকা এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে পিছিয়ে আছে। সড়ক, নেটওয়ার্ক এবং পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ে যাওয়া এবং গভীর অনুসন্ধান করা সবসময় সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতায় অনেক সংবাদ তৈরি হয় সীমিত তথ্য, স্থানীয় সূত্র অথবা তৃতীয় পক্ষের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে বা আংশিকভাবে উপস্থাপিত হয়। এতে পাঠকের কাছে বাস্তবতার একটি অসম্পূর্ণ ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উপরন্তু দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থা এবং সময়সাপেক্ষ যাতায়াতও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। ভূমি, পরিচয়, উন্নয়ন, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ইস্যু এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ইস্যু নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি জটিল থাকায় সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, সামাজিক চাপ বা বিভিন্ন পক্ষের সংবেদনশীল অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতাকে সীমিত করে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা প্রসঙ্গ জাতীয় গণমাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

?পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়গুলো প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন গোষ্ঠী, মতাদর্শ এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখানে সক্রিয়। ফলে সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কখনও কখনও নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বা মতাদর্শের প্রভাব দেখা যায়। যদি সংবাদ একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপিত হয়, তবে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত বাস্তবতা আড়ালে চলে যায়। সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো নিরপেক্ষতা, কিন্তু বাস্তবে এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সবসময় সহজ নয়, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে। তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সব গণমাধ্যম বা সাংবাদিক একভাবে কাজ করেন না। অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, সংস্কৃতি এবং সংকটকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরছেন। অনেক সাংবাদিক ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম এলাকায় গিয়ে রিপোর্টিং করেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সংগ্রহ করেন এবং জনগণের সমস্যা তুলে ধরেন। এই ধরনের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সমালোচনার পাশাপাশি এই ইতিবাচক ভূমিকার স্বীকৃতিও দেওয়া প্রয়োজন।

?পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকরা অনেক সময় সীমিত সম্পদ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সামাজিক চাপের মধ্যে কাজ করেন। ফলে সবসময় স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। কখনও কখনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ভয়, সামাজিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাব সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে সীমিত করে। এসব কারণে সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য সত্য অনুসন্ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একজন সাংবাদিকের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত সত্যের অনুসন্ধানকারী হিসেবে, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে নয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব পরিস্থিতি সবসময় এই আদর্শ বজায় রাখতে সহায়তা করে না।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। পাঠক বা দর্শক তখনই কোনো সংবাদকে গ্রহণযোগ্য মনে করে, যখন সেখানে সত্যতা, নিরপেক্ষতা এবং তথ্যের যথার্থতা থাকে। কিন্তু যখন সংবাদ অসম্পূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট বা যাচাইবিহীন হয়, তখন গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল অঞ্চলে এই বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা আরও কঠিন। কারণ এখানে একাধিক জাতিগোষ্ঠী, ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আলাদা সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান। তাই সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজন বহুপক্ষীয় তথ্য যাচাই, গভীর গবেষণা এবং দায়িত্বশীল উপস্থাপন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক ঘটনার ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শুধু ঘটনার বর্ণনা দেয় না, বরং ঘটনার পেছনের কারণ, প্রভাব এবং সমাধানের দিকও তুলে ধরে। এটি নীতি নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান পরিবেশ এবং সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অনুসন্ধান অত্যন্ত প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হলে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সাংবাদিক তৈরি করতে হবে। তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এম মহাসিন মিয়া

লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত