প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জুন, ২০২৬
আমরা যারা ?গ্রামে বড় হয়েছি তারা একটা বিষয় অবশ্যই খেয়াল করেছি যে, গ্রামে পরিবারের নারী সদস্য সবার শেষে ঘুমাতে যায় আর সবার প্রথমে ঘুম থেকে ওঠে। খুব ভোরবেলা যখন চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা থাকে, তখন থেকেই আমাদের গ্রামীণ নারীদের হাড়ভাঙা খাটুনি শুরু হয়। রান্না করা, বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে গোয়ালঘর পরিষ্কার, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগির পালন সব কাজ তারা একহাতে সামলান। রোদণ্ডবৃষ্টি মাথায় নিয়ে পুরুষদের পাশাপাশি কিংবা পুরুষরা যখন কাজের খোঁজে শহরে চলে যান, তখন একা একাই মাঠে ফসল ফলান এই নারীরা। ধানের মৌসুমে আমরা দেখতে পাই ধান সেদ্ধ করা, শুকানো, চাল করা থেকে শুরু করে বীজ সংরক্ষণের মতো কৃষির মূল কাজগুলো নারীরাই করেন। অথচ দুঃখের বিষয় হলো, এত কষ্টের পরও আমাদের সমাজ তাদের ‘কৃষক’ হিসেবে মর্যাদা দেয় না। সমাজ তাদের এই বিশাল পরিশ্রমকে বড়জোর ‘ঘরের কাজ’ বা ‘স্বামীর সাহায্য’ বলে মনে করে, যার ফলে দিন শেষে তারা কেবলই ‘গৃহিণী’ রয়ে যান, ‘কৃষক’ হতে পারেন না।
আমাদের গ্রামীণ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের এই পরিচয়হীনতার প্রধান কারণ হলো তাদের জমির মালিকানা না থাকা। সমাজে নারীদের নামে জমি থাকার হার খুবই কম; জমি সাধারণত শ্বশুর, স্বামী বা ভাইয়ের নামে থাকে। আমাদের দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যার নামে জমি থাকে, সরকারি খাতায় তাকেই চাষি ধরা হয়। জমি না থাকার এই এক অজুহাতে নারীরা সমাজ এবং রাষ্ট্র- উভয় জায়গাতেই অধিকারবঞ্চিত থেকে যান। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী কৃষকদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা ডাটাবেজ না থাকায় সরকারের দেওয়া কোনো সাহায্যই সরাসরি তাদের হাতে পৌঁছায় না। খরা বা বন্যায় ফসল নষ্ট হলে সরকারি ক্ষতিপূরণ, ভর্তুকি মূল্যে সার-বীজ কিংবা ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ- সব সুযোগ-সুবিধাই পুরুষদের নামে চলে যায়। অধিকারের এই বঞ্চনার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীরা সঠিক মূল্যায়ন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও পিছিয়ে আছেন। এখন তো চাষাবাদের ধরন অনেক উন্নত হয়েছে, এসেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ। কিন্তু গ্রামীণ সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে বা নারী বলে তুচ্ছ করায়, সরকারি বিভিন্ন কৃষি প্রশিক্ষণ বা উঠান বৈঠকে নারীদের তেমন একটা ডাকা হয় না। ফলে মাঠে সরাসরি কাজ করলেও তারা আধুনিক কৃষি জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। টাকার অভাবে অনেক সময় তারা চড়া সুদে এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা তাদের আরও বেশি ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে। অথচ এই অদৃশ্য কারিগরদের একটুখানি কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা দিলে আমাদের কৃষি উৎপাদন আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করি।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে নারীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, তাদের এভাবে অবহেলা করে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা সরকারের কাছে কোনো দয়া বা অনুগ্রহ চান না, চান নিজেদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে প্রকৃত নারী কৃষকদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করা এবং জমির মালিকানা যার নামেই থাক না কেন, প্রকৃত শ্রমের ভিত্তিতে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক ‘কৃষি কার্ড’ দেওয়া। রাষ্ট্র যদি এই অবহেলিত নারীদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করে তাদের পাশে দাঁড়ায়, তবেই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি আরও মজবুত হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে কোনোদিন সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই এই বিষয়ে আন্তরিক দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
মো. আব্দুল্লাহ খান
শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়