প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রংপুর বাংলাদেশের একটি অবহেলিত জনপদের নাম। যারাই যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় থেকেছে তারাই এই অবহেলা প্রদর্শন করেছে। দেশে যখনই দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশিত হয় দেখা যায় রংপুর বিভাগের অন্তত পাঁচটি জেলা দারিদ্র্যের শীর্ষে থাকে। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকার রংপুর বিভাগে জীবনমান উন্নয়নে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি যাতে রংপুরের মানুষের গড় উন্নয়ন বৃদ্ধি পেতে পারে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সারা দেশে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
এর একটিও রংপুর বিভাগে নেই। হাজার হাজার কোটি টাকার যে উন্নয়ন হলো সেই উন্নয়ন রংপুর বিভাগ পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। রংপুরে বিভাগ প্রতিষ্ঠা, সিটি কর্পোরেশন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ ব্যবস্থা চালু হলেও এগুলোর উন্নয়নে তেমন অর্থ বরাদ্দ ছিল না এবং বিভাগে সিটি কর্পোরেশনের মাস্টার প্ল্যানই করা হয়নি।
প্রতি বছর বন্যায় এ অঞ্চল ডুবে গেলে সুপেয় পানির প্রয়োজন হয় কিন্তু সুপেয় পানিরও সুষ্ঠু ব্যবস্থা এখানে নেই।
রংপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকলেও সেগুলোর চিকিৎসার মান অত্যন্ত নিম্ন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও এগুলোতে অর্থ বরাদ্দ প্রায় নামমাত্র।
সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলের শিক্ষার মানও তাই পিছিয়ে আছে।
এ অঞ্চলের সবচেয়ে অবহেলিত খাতগুলোর একটি হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও রংপুরের সঙ্গে ব্রডগেজ কোনো রেল যোগাযোগ নেই। রংপুর থেকে পার্বতীপুরে ৪০ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন স্থাপনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। এ অঞ্চলের বিদ্যমান রেললাইন ও ট্রেনের মান এতটাই নিম্নমানের যে যাত্রীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে কলকাতাকেন্দ্রিক যে রেল যোগাযোগ ছিল সেটির ওপর ভর করে রংপুরের সঙ্গে ঢাকার রেলপথ তৈরি করা হয়েছে। লালমনিরহাট থেকে ট্রেন নাটোর-পাবনা হয়ে কলকাতায় যেত।
বর্তমানে ওই রেলপথ ধরেই এ অঞ্চলের ট্রেন ঢাকায় যায় এবং কুড়িগ্রাম থেকে রেল পথে ঢাকায় যেতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। রেল যোগাযোগের মতো সড়ক যোগাযোগের অবস্থাও করুণ। একটি বৃত্তের প্রায় অর্ধেক ঘুরে এ অঞ্চলের মানুষকে সড়কপথে ঢাকায় যেতে হয়। ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর একটি সেতু স্থাপন করলে এ পথের দূরত্ব ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত কিন্তু বিগত সরকারের এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ ছিল না।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ শুধু একটি নাম নয় আন্দোলনের বাঁকবদলের এক অনন্য শক্তি। এ অঞ্চলের মানুষের আশা ছিল গণঅভ্যুত্থানের পর এবার তারা ন্যায্য অধিকার পাবে কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশার বাণী দিলেও এ অঞ্চলের মানুষের বঞ্চনার চরিত্র বদলায়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রংপুর বিভাগের জন্য কিছু বরাদ্দ রাখা হয়েছে তবে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় তা এত কম যে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানো তো দূরের কথা স্বাভাবিক উন্নয়নের ধারায় আসতেও কতকাল লাগবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকার বগুড়া বিমানবন্দর উন্নয়নের জন্য কাজ করছে কিন্তু লালমনিরহাটে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বলে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক বিমানবন্দর পড়ে আছে অবহেলায় যা উন্নয়ন করলে সামরিক ও বেসামরিক দুই দিক থেকেই দেশের কাজে লাগবে।
ভারত যেহেতু সীমান্তের ওপারে কোচবিহারসহ বেশ কিছু বিমানবন্দর সচল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে তাই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে বগুড়ার পাশাপাশি এ বিমানবন্দরও চালু করা জরুরি।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাথরসহ নানা ধরনের কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানি হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এবারের বাজেটে এই স্থলবন্দরগুলোর উন্নয়নে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন বরাদ্দ দেখা যায়নি। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুর্দশা নদীভাঙন। তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য এবারের বাজেটে কিছু অর্থ রাখা হয়েছে বটে কিন্তু উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন বদলাতে যে বিনিয়োগ দরকার এই বরাদ্দ তার ধারেকাছেও নেই। এ অঞ্চলটি কৃষিনির্ভর।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকেরা সার ও বীজ ভর্তুকিসহ যে সুযোগ-সুবিধা পান রংপুরের কৃষকেরা সেই তুলনায় বরাবরই পিছিয়ে থাকেন। কৃষকেরা কষ্ট করে যে ফসল উৎপাদন করেন যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে তারা তার ন্যায্য মূল্য পান না। এ অঞ্চলের মানুষ এখনও আশা করে বর্তমান সরকারের আমলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, কৃষকদের জন্য ফসল সংরক্ষণের হিমাগার নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রংপুর হাসপাতালসহ জেলা সদর হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার মান ও টেকসই উন্নয়নে সরকার কাজ করবে এবং এর মধ্য দিয়েই দূর হবে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা।
পাশাপাশি সরকার যদি একটি বৈষম্য নিরসন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে তাহলে শুধু রংপুর নয় সারা দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নে ভারসাম্য সৃষ্টি হবে। জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেই বাংলাদেশ গড়ে উঠুক রংপুরের মানুষও পাক সমান নাগরিক অধিকার।
মো. মাজহারুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া