প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ জুন, ২০২৬
সকালের আলো ফুটতেই যখন শিশুরা বইয়ের ব্যাগ কাঁধে চিরচেনা বিদ্যালয়ের পথে হাঁটার কথা, তখন দেশের অনেক শিশু ছুটে যায় পেটের দায়ে কর্মস্থলের দিকে। কারও হাতে বইয়ের বদলে চায়ের ট্রে, কারও হাতে খাতার বদলে ইট কিংবা ময়লা সংগ্রহের বস্তা। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, স্বপ্ন পূরণে লেগে থাকার কথা সে বয়সেই তারা জীবিকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বইয়ের ব্যাগের পরিবর্তে জীবিকার বোঝা কাঁধে তুলে নেওয়া এই শিশুদের গল্প আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তব সত্য। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি চলমান। তবু রাস্তাঘাট, বাজার, হোটেল, গ্যারেজ কিংবা কল-কারখানায় কর্মরত শিশুদের উপস্থিতি সেই অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে ১৫ লাখেরও বেশি শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত, যাদের একটি বড়ো অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। একটি শিশুর শৈশব শুধু তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই শৈশবই আজ পেটের দায়ে জীবিকার কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। দারিদ্রতা এই সংকটের জন্য দায়ী। অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই যেখানে হিমশিম খায়, অভাব যেখানে নিত্যসঙ্গী, শিক্ষা সেখানে বিলাসিতা। বাবা-মা অনেক সময় বাধ্য হয়েই সন্তানকে কাজে পাঠান, কারণ তাদের কাছে তখন শিক্ষা নয়, দুবেলার খাবার জোগাড় করাই বড়ো চ্যালেঞ্জ। ফলে বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রই হয়ে ওঠে শিশুর শৈশব তথা গন্তব্য। তবে শুধু দারিদ্র্যই নয়, শিক্ষার প্রতি অনীহা, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক উদাসীনতাও এই সমস্যাকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিভিন্ন কারণে শিশুরা ঝরে পড়ে। এরপর তারা সহজেই শ্রমবাজারের অংশ হয়ে যায়। সমাজও অনেক সময় বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে। শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিশুর জীবনে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক শিশু অপুষ্টি, অসুস্থতা এবং নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটায়। কঠোর পরিশ্রম তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তারা বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না, বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, নিজের ইচ্ছামতো বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। তাদের শৈশব যেন দায়িত্বের ভারে চাপা পড়ে যায়। একজন শিশুশ্রমিকের কষ্ট শুধু তার পরিশ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তারা অবহেলা, বঞ্চনা, এমনকি নির্যাতনেরও শিকার হয়। রোদণ্ডবৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করলেও তারা যথাযথ পারিশ্রমিক পায় না। কেউ কেউ ক্ষুধা নিয়ে দিন কাটায়, আবার কেউ স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলে। তাদের চোখে তখন বইয়ের পাতা নয়, জীবনের কঠিন সংগ্রামের ছবি ভেসে ওঠে। শিশুশ্রমের প্রভাব শুধু একটি শিশুর জীবনে নয়, পুরো সমাজের ওপর পড়ে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুরা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারায়। ফলে দেশও তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন প্রতিটি শিশু শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকার ভোগ করতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দারিদ্র্যতার বৃত্তাকার চক্র। শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়া একটি শিশু বড়ো হয়েও কম আয়ের কাজে আটকে থাকে, এবং তার সন্তানও একই পথ ধরে। অথচ প্রতিটি শিশুর ভেতরেই রয়েছে অসীম সম্ভাবনা। শৈশবেই সেই সম্ভাবনাকে অবরুদ্ধ করার অধিকার আমাদের নেই।
এই সমস্যা সমাধানে আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার এরইমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনও আসেনি। দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে সহায়তা করা প্রয়োজন। শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করতে হবে। শিশুশ্রম বন্ধে বিদ্যমান আইন আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মানুষ শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে না দেখে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিশুশ্রমের মত ঘৃণ্য কাজকে সমাজ হতে উপড়ে ফেলতে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমরা যদি কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত দেখতে পাই, তবে সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ না করে তার শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে ভাবতে হবে। কারণ প্রতিটি শিশুর অধিকার আছে সুন্দর শৈশব, শিক্ষা এবং স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ পাওয়ার। বইয়ের ব্যাগের বদলে জীবিকার বোঝা কোনো শিশুর প্রাপ্য হতে পারে না। একটি সভ্য সমাজ কখনোই শিশুদের কাঁধে দায়িত্বের ভার চাপিয়ে দিয়ে উন্নয়নের দাবি করতে পারে না। প্রতিটি শিশুর হাতে বই থাকুক, চোখে থাকুক স্বপ্ন, এই দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, বরং আমার, আপনার, সবার।