ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মোবাইলনির্ভর শৈশব : হারিয়ে যাচ্ছে সৃজনশীলতা

সুমনা আক্তার
মোবাইলনির্ভর শৈশব : হারিয়ে যাচ্ছে সৃজনশীলতা

একটা সময় ছিল, যখন বিকাল মানেই ছিল মাঠভরা শিশুদের হাসি, কাগজের নৌকা, গাছে চড়া, লুকোচুরি, গোল্লাছুট আর মাটিতে রঙিন স্বপ্ন আঁকার আনন্দ। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন অনেক শিশুর শৈশব সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের অনলাইন পর্দায়। বাস্তবের খেলার মাঠের বদলে ভার্চুয়াল গেম, গল্পের বইয়ের বদলে ভিডিও রিলস, আর বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরত স্ক্রলিং- এ যেন আধুনিক শৈশবের নতুন বাস্তবতা। প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন যেমন জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডারের দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের সৃজনশীলতা, সামাজিকতা ও মানসিক বিকাশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বর্তমান বিশ্বে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন প্রয়োজন - সব ক্ষেত্রেই এর অবদান অনস্বীকার্য। শিশুদের জন্যও মোবাইল একটি কার্যকর শিক্ষাসহায়ক হতে পারে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, শিক্ষামূলক অ্যাপ, ভাষা শিক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক ভিডিও, গণিত চর্চা কিংবা নতুন দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দূরশিক্ষা ব্যবস্থায় মোবাইল অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তির মতো মোবাইলেরও একটি সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলেই শুরু হয় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দৈনিক স্ক্রিন টাইম ১ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।

অথচ বাস্তবে অনেক শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে। ফলে তার কল্পনাশক্তি ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। গল্প বানানো, ছবি আঁকা, বই পড়া, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ড কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে অবাধ খেলাধুলা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও সামাজিক আচরণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মোবাইলনির্ভর জীবন শিশুদের বাস্তব জগত থেকে দূরে সরিয়ে ভার্চুয়াল জগতে আটকে রাখছে। ফলে তারা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কম সময় কাটায়, এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের একাকীত্ব ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়।

অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের শারীরিক প্রভাবও কম নয়। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে চোখে চাপ পড়া, ঘুমের ব্যাঘাত, ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু ও কিশোর। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা, ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। ইন্টারনেটের উন্মুক্ত জগৎ শিশুদের জন্য নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি করেছে। অনুপযুক্ত বিষয়বস্তু, ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং গেমিং আসক্তি শিশুদের মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবকদের সচেতন তদারকি এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে মোবাইলকে এককভাবে দোষারোপ করাও ঠিক হবে না। প্রযুক্তি নিজে কখনো ভালো বা খারাপ নয়,এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে ফলাফল। যদি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মোবাইল ব্যবহার করা হয়, শিক্ষামূলক বিষয়বস্তুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে মোবাইল শিশুদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ - সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি হবে শিক্ষার হাতিয়ার, শৈশবের বিকল্প নয়। তাদের হাতে যেমন স্মার্টফোন তুলে দিতে হবে, তেমনি তুলে দিতে হবে একটি বই, একটি গাছের চারা, একটি রঙতুলি এবং একটি সবুজ মাঠের স্বাধীনতা। শৈশবের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মুক্ত আকাশের নিচে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দে। প্রযুক্তিকে জীবনের সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু কখনোই শৈশবের বিকল্প হিসেবে নয়। কারণ একটি সৃজনশীল, মানবিক ও সুস্থ শৈশবই একটি আলোকিত জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

সুমনা আক্তার

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত