ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের ভাবনা : সবার আগে বাংলাদেশ

আবু আফজাল সালেহ
জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের ভাবনা : সবার আগে বাংলাদেশ

৬ জুলাই আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে পল্লী উন্নয়ন দিবস। এবারের জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘উন্নত পল্লী সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি জাঁকজমকভাবে পালন করছে। সরকার, প্রশাসন এবং বিভিন্ন দপ্তর বিআরডিবেকে সার্বিক সহযোগিতা করছে। পল্লীর নারীর ক্ষমতায়ন, সংগঠনের উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বাস্তবায়ন, পল্লী উন্নয়নের কার্যক্রমের প্রচার ইত্যাদি হচ্ছে এ দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য।

২১ এপ্রিল-২০২৬ পরিপত্রের মাধ্যমে সরকার এ বছর থেকে প্রতিবছর ৬ জুলাই জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস পালন করবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দিবসটি ‘খ’ শ্রেণি হিসাবে প্রতিবছর পালিত হচ্ছে। গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের প্লেনারিতে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতি বছর ৬ জুলাইকে ‘বিশ্ব পল্লী উন্নয়ন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশের পেশকৃত একটি রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়েছে। দিবসটি পালনের জন্য পল্লী উন্নয়নে সফলভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)-কে প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিসহ জিয়া সরকারের সময় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লব ঘটানোর অন্যতম কারিগর বিআরডিবি-কে দিয়ে সরকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এ দিবসকে সামনে রেখে রালি, বিভিন্ন উন্নয়ন ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। রাজনীতিক, প্রশাসন, বিআরডিবিসহ পল্লী উন্নয়নের স্টকহোল্ডাররা, সুশীল সমাজ-সাংবাদিক প্রতিনিধি আলোচনা করে ভবিষ্যতের একটি রূপরেখা তৈরি করা হবে। সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন পলিসি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস। প্রথবার পালিত হওয়া পল্লী উন্নয়ন দিবস থেকে আমার এসব আন্তরিক চাওয়া।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমান্বয়ে দূর করার কথা বলা আছে। এই উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকরণ, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশের কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্তার উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তনের কথা বলা আছে। মূলত সংবিধানের এ অনুচ্ছেদের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার ফ্যামিলিকার্ড, কৃষি কার্ড-সহ বিভিন্ন কল্যাণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সব সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে পল্লী উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা নিতে হবে। পল্লী উন্নয়নে সরকারের একটি প্রাচীন সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। পূর্বের আইআরডিপি কৃষিক্ষেত্রে যে ব্যাপক সাফল্য এনে দিয়েছে সে কথা বিবেচনা করলে ও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সফলতা ও আন্তরিকতায় বিআরডিবি একটি সরকারের পরীক্ষিত সংস্থা। পিআরডিপি (জাপানের সহযোগিতায়), ডানিডা (ইউরোপ) ও বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিআরডিবি সংশ্লিষ্ট দেশ-সংস্থার ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিআরডিবির অবদান অস্বীকার করা যায় না। বিআরডিবি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে এবং রাখছে। বিআইডিএসের ২০১০ সালের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিক কার্যক্রমের ওপর মূল্যায়নে জিডিপিতে বিআরডিবির অবদান ১ দশমিক ৯৩ ভাগ। এ হার দেশের আহরিত বৈদেশিক সহায়তার প্রায় সমতুল্য। এ হার ক্রমেই বেড়েই চলেছে। ফলে, পল্লী উন্নয়ন দিবস সামনে রেখে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)-কে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য ‘পল্লী উন্নয়ন’ অধিদপ্তরে রূপান্তর করা যেতে পারে। তখন, সং¯’াটির সক্ষমতা বেড়ে যাবে এবং ‘পল্লী উন্নয়ন’-কেন্দ্রিক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে সরকারের উন্নয়ন অংশীদার হতে পারে।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পলিসি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শহর-গ্রামে অনেক পার্থক্য কমে গেছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। জাপান বা ভিয়েতনামে সরাসরি কৃষি খাতের অবদান কমছে। কিন্তু কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থনীতিতে অবদান ক্রমেই বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি ভারতেও একই অবস্থা। অনেক উন্নত দেশেও এ অবস্থা বিরাজ করছে। আশার কথা হচ্ছে, বৈচিত্র্য ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের অগ্রসরমান গ্রামীণ অর্থনীতিতে। শহরের পাশাপাশি এখন গ্রামেও বাড়ছে বিনিয়োগ। কৃষিজ ও অকৃষিজ কর্মকাণ্ড বহুগুণ এবং বহুমুখী সম্প্রসারণ হয়েছে এবং এ ধারা চলমান রয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার পাওয়ায় গ্রামীণ জনপদে বিনিয়োগ বেড়েই চলছে। গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অকৃষি খাতের অবদানও বাড়ছে। আমাদেরও কুটিরশিল্প বা কৃষি-সংশ্লিষ্ট উৎপাদনে জোর দিতে হবে। এজন্য পরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প-উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এসব পরিকল্পনা বিআরডিবি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।

বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পূর্বশর্তই হচ্ছে : শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান, তফাৎ ও বৈষম্য নির্মূল করা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান বা ইশতেহার বাস্তবায়ন করা গেলে শহর-গ্রামের সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান কমে আসবে। যদি এই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ হবে এমন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র, যেখানে গ্রামে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ পাবে শহুরে জীবনের নানা সুযোগ-সুবিধা। গ্রামপর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবা কেন্দ্র, ওয়ার্কশপ ¯’াপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করতে হলে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট কৃষিযন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। বিআরডিবি পল্লী উন্নয়নে সরকারের বড় ও পরীক্ষিত সংস্থা। আশির দশকের কৃষি বিপ্লবে এ সংস্থার ভূমিকা সর্বজনগ্রাহ্য। বিআরডিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে সরকারের জনকল্যাণমূখী কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সহযোগী হিসাবে কাজ করতে পারবে। পল্লী উন্নয়নে সবাইকে একত্রিত হতে হবে, সব সেক্টোরকে এগিয়ে আসতে হবে। পল্লীর উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। কেননা, বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতাংশ, যা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় সতত সেটা অনুসরণ করতে হবে-

...But I have promises to keep,

And miles to go before I sleep,

And miles to go before I sleep.

(Robert Frost)

পল্লী উন্নয়নের জন্য একটা স্ট্র্যাটেজি প্রয়োজন। এতে কৃষির পাশাপাশি অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়াবে, যাতে ভূমিহীনরা সহজ কর্মসংস্থান পাবে, কৃষি উৎপাদন বাড়াবে, গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, শ্রমের মোবিলিটি সহজ করবে, যাতে শ্রমিকরা জেলা সদর কিংবা রাজধানী শহরে গিয়ে কাজ পান, নিজ গ্রামেই বা পাশের শহরে নিজের উৎপাদিত পণ্য বেচাকেনা করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সমবায় কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা দরকার। বিআরডিবির আওতাধীন প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক সমিতিগুলো সক্রিয় করে শক্তিশালী করতে হবে।

আবু আফজাল সালেহ

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত