প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক অনন্য মাইলফলক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের যে সুদীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এই ভূখণ্ডে বিদ্যমান, জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থান তারই এক আধুনিক ও চূড়ান্ত স্ফুরণ। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে গণতন্ত্র হরণ, কাঠামোগত বৈষম্য, অবিচার ও দুর্নীতি ঘিরে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তার সর্বপ্লাবী বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই আন্দোলনে। বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অচিরেই এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ফলস্বরূপ দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনরোষের মুখে কোনো ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তবে এই ঐতিহাসিক অর্জনের নেপথ্যে রয়েছে তীব্র রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগ। এই অভ্যুত্থানের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও পরিসংখ্যানিক মানচিত্রায়ণ এর প্রকৃত গভীরতা ও বিস্তৃতি অনুধাবনে আমাদের সহায়তা করে।
গণঅভ্যুত্থান দমাতে শাসকগোষ্ঠীর বলপ্রয়োগ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত নিপীড়নের মাত্রা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। আন্দোলন যখন সর্বাত্মক রূপ ধারণ করে, তখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সুনির্দিষ্ট ব্লুপ্রিন্ট থেকে সরকার, তাদের মদদপুষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো নগ্নভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়। রাজপথে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর কেবল বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড বা টিয়ার শেলই নিক্ষেপ করা হয়নি; বরং দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আকাশপথে হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত হালনাগাদ করা উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনে নারী, শিশু ও কিশোরসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন। মূলত শাসকগোষ্ঠী জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মাত্রাকে অনুধাবন করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। আর এ কারণেই তারা আন্দোলন দমাতে কাঠামোগত ও প্রত্যক্ষ সহিংসতার পথ বেছে নেয়, যা চূড়ান্তভাবে গণমানুষের ক্ষোভের আগুনকে দাবানলে পরিণত করে একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে হতাহতের সরকারি হিসাব বিশ্লেষণ করলে সংঘাতের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলায় গড়ে প্রায় ১৩ জন শহিদ এবং ২১৬ জন আহত হয়েছেন। তবে পরিসংখ্যানে হতাহতের এই বিশাল পার্থক্য বা ‘স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশ করে।
এর সহজ অর্থ হলো- সারা দেশে এই সহিংসতা সব জায়গায় সমানভাবে ঘটেনি। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়ন ও তাণ্ডব চরম মাত্রায় ছিল, আবার অন্যান্য এলাকায় তা তুলনামূলক কম ছিল। এছাড়া গড়ে শহিদ হওয়ার চেয়ে আহত হওয়ার ঘটনা প্রায় ১৭ গুণ বেশি। বিপুলসংখ্যক আহতের এই হিসাবই প্রমাণ করে, অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে রাজপথের প্রতিটি ইঞ্চি কতটা তীব্র সংঘাত আর সাধারণ মানুষের জোরালো প্রতিরোধের সাক্ষী হয়েছিল।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সহিংসতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী ঢাকা। দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হওয়া এবং উন্নত শিক্ষার আশায় সারা দেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতির কারণে ঢাকায় হতাহতের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চসংখ্যক শহিদ (স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে ২২৯ জন ও বর্তমান ঠিকানায় ২৩১ জন) এবং আহত (স্থায়ী ঠিকানায় ৪,৬৬৭ জন ও বর্তমান ঠিকানায় ৫,৮১৩ জন) হয়েছেন। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম (২,০৪৫ জন), বরিশাল ও সিলেটেও বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহতের শিকার হন। এতে একটি বিষয় স্পষ্টণ্ডে যেসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেশি ছিল, সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়ন ও সংঘাতের মাত্রাও ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। মূলত দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ছাত্র-জনতা ঢাকায় অবস্থান করে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন এবং বুকের রক্ত দিয়েছেন। এভাবেই এই অভ্যুত্থান নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের গণ্ডিতে আটকে না থেকে এক সর্বজনীন ও জাতীয় রূপ লাভ করেছিল।
অভ্যুত্থানে হতাহতের পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম নির্মমতার একটি গাণিতিক প্রমাণ। পরিসংখ্যান বিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ‘পিয়ারসনের কোরিলেশন’ বা পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্র প্রয়োগ করে দেখা গেছে, আন্দোলনে আহত এবং শহিদ হওয়ার ঘটনার মধ্যে ০.৯০০ মাত্রার একটি অত্যন্ত জোরালো ও ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। সহজ কথায়, দেশের যে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, ঠিক একই জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যানের এই উচ্চমাত্রার মিল কোনোভাবেই আকস্মিক বা কাকতালীয় হতে পারে না; বরং এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আন্দোলন দমাতে শাসকগোষ্ঠী কতটা সুপরিকল্পিত ও মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যেখানেই ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ সবচেয়ে তীব্র ও ঘনীভূত ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক সেখানেই সবচেয়ে বেশি মারণাস্ত্র ও সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে। অর্থাৎ, আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুগুলোতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছে। ফলে একই স্থানে যেমন অগণিত মানুষ বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তেমনি অসংখ্য তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে। গাণিতিক এই বিশ্লেষণ কেবল গণঅভ্যুত্থানের ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে না, বরং উন্মোচন করে—কীভাবে একটি ব্যবস্থা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সুনির্দিষ্ট ছকে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।
ভূ-স্থানিক (জিও-স্পেশিয়াল) প্রযুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ করলে আন্দোলনে হতাহতের ধরনটি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ‘মোরানস আই’ ও ‘গেটিস-অর্ড জি* নামক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে দেখা যায়, হামলায় আহত হওয়ার ঘটনাগুলো মোটেও এলোমেলো ছিল না; বরং ০.১১৭ সূচকে এটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘গুচ্ছ’ বা ক্লাস্টার তৈরি করেছে। এর ফলে ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জসহ দেশের মধ্যাঞ্চল ৯৯% নিশ্চিতভাবে (কনফিডেন্স লেভেল) অতি উচ্চ ঝুঁকির ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেই ছাত্র-জনতার ওপর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও ঘনীভূত আক্রমণ চালানো হয়েছিল। দার্শনিক হান্না আরেন্টের চিন্তাধারার সাথে এই ডেটা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের এই আচরণ ছিল ক্ষমতার এক নির্মম প্রদর্শনী; এই সহিংসতার পেছনে কেবল তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ভৌগোলিক কৌশল কাজ করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়, এটি আধুনিক বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে রক্ত দিয়ে লেখা এক চিরস্থায়ী অধ্যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপাত্তের ভিত্তিতে পরিচালিত এই ভূ-স্থানিক ও পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ আমাদের স্পষ্টভাবে দেখায়, কীভাবে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা নিজের পতন ঠেকাতে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে মানবতাবিরোধী অপরাধের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাতে পারে। পার্বত্য জেলাগুলো বাদে সারা দেশেই কমবেশি এই গণজাগরণের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল; তবে দেশের মধ্যাঞ্চলের মাটি যে সবচেয়ে বেশি রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, তা এই বিশ্লেষণে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ হয়ে রইল। এই মানচিত্রায়ণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—নির্বিচার বুলেট আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে তারুণ্যের অপ্রতিরোধ্য তরঙ্গকে কখনোই অবরুদ্ধ করা যায় না। ক্ষমতার দম্ভ নয়, জনমানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাই একটি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ামক। শহিদের রক্তস্নাত এই ইতিহাস যুগে যুগে স্বাধীনতাকামী মানুষকে পথের দিশা দেবে এবং ইনসাফভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ