ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র : সর্বত্র মেধা, সততা, যোগ্যতা ও সুশাসনের জয় হোক

জুবাইয়া বিন্তে কবির
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র : সর্বত্র মেধা, সততা, যোগ্যতা ও সুশাসনের জয় হোক

রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন উন্নয়নের পরিমাপ কেবল সেতু, সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নির্ধারিত হয় ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র মেধার মূল্য দেয়, যোগ্যতাকে সম্মান করে এবং অন্যায়ের প্রতিকার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই জাতির অগ্রযাত্রার অপরিহার্য স্তম্ভ। এসব প্রতিষ্ঠানে যদি সততা, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি সুদৃঢ় হয়, তবে নাগরিকের আস্থা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও আরও মজবুত হয়। একজন সৈনিক, একজন শিক্ষক, একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা কিংবা একজন চাকরিপ্রার্থী সবারই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্মান। সেই সম্মান যখন অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত শুধু ব্যক্তি নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। তাই আজ সময়ের দাবি একটাই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মেধা, সততা ও যোগ্যতাই হবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের একমাত্র মানদণ্ড।

দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিয়ে যারা জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব। একজন সেনা, নৌ বা বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি মুহূর্তে শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করেন। এমন একজন কর্মকর্তাকে যদি রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রশাসনিক বৈষম্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রেরও ব্যর্থতা। রাষ্ট্র ভুল করতে পারে, সরকারও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয় হলো সে নিজের ভুল সংশোধনের সাহস রাখে। দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তার বিষয়ে সরকারের পুনর্মূল্যায়ন এবং তাঁদের মর্যাদা ও প্রাপ্য অধিকার পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করে। এটি প্রতিশোধের নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন হওয়া উচিত।

আর্থিক ক্ষতি একসময় পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু অন্যায়ভাবে হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। অনেক কর্মকর্তা হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় নীরবে পার করেছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছেও প্রশ্ন ছিল- কেন এই বঞ্চনা? রাষ্ট্র যখন ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন সেটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না; তা হয়ে ওঠে নৈতিক পুনর্বাসনের প্রতীক। রাষ্ট্রের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো যোগ্য নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও যখন একজন মেধাবী তরুণ/তর চাকরি পান না, অথচ অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত অযোগ্য কেউ কাঙ্ক্ষিত পদে নিয়োগ পান, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। সেই হতাশা ধীরে ধীরে আস্থাহীনতা, ক্ষোভ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়।

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মেধাসম্পদ। একজন মেধাবী, সৎ ও দক্ষ মানুষকে যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা না হয়, তবে সেই ক্ষতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; রাষ্ট্রও তার সম্ভাবনাময় একজন নির্মাতাকে হারায়। যে রাষ্ট্র মেধাকে অবহেলা করে, সেখানে উদ্ভাবন থেমে যায়, প্রশাসনে দক্ষতা কমে যায় এবং উন্নয়নের গতি দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই নিয়োগ, পদোন্নতি ও মূল্যায়নের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মুক্তচিন্তা, গবেষণা, মতের বৈচিত্র্য, মেধা, এবং যোগ্যতার চর্চা সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়। এটা কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়; এগুলো জাতির চিন্তা, গবেষণা ও নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার। অথচ বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে কোথাও ব্যক্তিপূজা, কোথাও গোষ্ঠীবাদ, কোথাও চাটুকারিতা, আবার কোথাও ব্যক্তিগত অপছন্দ বা আনুগত্যের ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এমন বাস্তবতা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে দুর্বল করে এবং মেধার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই এমন একটি প্রতিষ্ঠান হতে হবে, যেখানে ব্যক্তি নয়, নীতি; আনুগত্য নয়, যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে সেখান থেকেই গড়ে উঠবে দক্ষ মানবসম্পদ এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের শক্ত ভিত।

যে প্রতিষ্ঠানে সত্য কথা বলার পরিবর্তে চাটুকারিতা পুরস্কৃত হয়, সেখানে সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। যোগ্য মানুষ নিরুৎসাহিত হন, আর অযোগ্যরা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান নেমে আসে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাটুকারিতার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে। তাই সৎ, স্বাধীনচেতা ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, সিন্ডিকেট, রিজেন্ট বোর্ড, সিনেট ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী ব্যক্তিগত মত, ব্যক্তি-স্বার্থ বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন। নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশই আগামী দিনের রাষ্ট্রনেতা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মানসিকতা গঠন করে।

সব অন্যায় প্রকাশ্যে ঘটে না। অনেক সময় যোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা, গবেষণার সুযোগ সীমিত করা, পদোন্নতি বিলম্বিত করা কিংবা প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করাও বৈষম্যেরই রূপ। এই নীরব বৈষম্য অনেক বেশি ক্ষতিকর, কারণ এটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে হতাশা, বিভাজন এবং অনাস্থার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাই জরুরি। মানুষ রাষ্ট্রকে ভালোবাসে তখনই, যখন রাষ্ট্র তার সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত