প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জুলাই, ২০২৬
আমরা কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে আগের চেয়ে বেশি যুক্ত, নাকি প্রযুক্তির অদৃশ্য জালে আটকে দিন দিন আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি? প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ফেসবুক স্ক্রল করা, ইনস্টাগ্রামে বন্ধুদের ঝলমলে মুহূর্ত দেখা কিংবা মেসেঞ্জারে দুয়েকটি বার্তার উত্তর দেওয়া এভাবেই কাটছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত প্রজন্মে বাস করছি আমরা। অথচ এই ঝকঝকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাসের অন্যতম একাকী প্রজন্মে পরিণত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা একে আখ্যা দিচ্ছেন ‘আধুনিক যুগের নীরব মহামারি’।
আজকের তরুণদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের ফ্রেন্ডলিস্টে হয়তো হাজার হাজার মানুষ রয়েছে, কিন্তু গভীর রাতে মন খারাপের মুহূর্তে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলার মতো একজন মানুষও অনেকের নেই। প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই কমিয়ে দিয়েছে।
আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান Cigna -এর এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে জেন-জি ও মিলেনিয়ালরা প্রবীণদের তুলনায় বেশি একাকিত্ব অনুভব করছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত একাকিত্বে ভোগেন। অথচ আগের প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।
একই চিত্র উঠে এসেছে BBC Loneliness Experiment-এ। প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে একাকিত্বের হার সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার প্রায় ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ, একাকিত্ব আর শুধু বার্ধক্যের সমস্যা নয়; এটি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে তরুণদের ওপর।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমরা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনকে ভার্চুয়াল জীবন দিয়ে প্রতিস্থাপন করছি। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী Melissa G. Hunt-এর গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মধ্যে FOMO (Fear of Missing Out) বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করে। অন্যের সাজানো-গোছানো, নিখুঁত জীবনের ছবি বারবার দেখতে দেখতে মানুষ অবচেতনেই নিজের সাধারণ জীবনের সঙ্গে তার তুলনা শুরু করে। সেই তুলনা জন্ম দেয় হীনম্মন্যতার, আর হীনম্মন্যতা মানুষকে আরও বেশি গুটিয়ে নেয় নিজের ভেতরে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আবার কিছুটা ভিন্ন। ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় শহরে আগের মতো খেলার মাঠ নেই, নেই পাড়া-মহল্লার প্রাণবন্ত বিকালের আড্ডা। যৌথ পরিবারের নিরাপদ সামাজিক বন্ধনও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ক্যারিয়ার, ফলাফল, জিপিএ এবং সাফল্যের নিরন্তর প্রতিযোগিতায় তরুণরা এমন এক ইঁদুর-দৌড়ে নেমেছে, যেখানে সহযাত্রীর চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা বেশি। এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা একাকিত্বকে আরও গভীর করছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর সংবাদেও এই সংকটের প্রতিফলন স্পষ্ট। প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ, তীব্র একাকিত্ব কিংবা আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতার পেছনেও সমাজবিজ্ঞানীরা একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সুস্থ বিনোদনের অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কংক্রিটের চার দেয়ালের ফ্ল্যাট-সংস্কৃতি আমাদের এমন এক সমাজে নিয়ে এসেছে, যেখানে পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকেন, সেটিও অনেক সময় আমরা জানি না। এই নীরব সংকট থেকে একটি প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সমাধানের শুরু হোক পরিবার থেকেই। খাবার টেবিল কিংবা পারিবারিক আড্ডার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখা যেতে পারে। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে শুধু পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নয়, মানসিক অবস্থা, ভয়, স্বপ্ন ও অনুভূতি নিয়েও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবা, ক্লাব কার্যক্রম এবং দলগত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ও উৎসাহ বাড়াতে হবে। এসব কার্যক্রম সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তরুণদের নিজেদের উদ্যোগেই ছোট ছোট ইতিবাচক কমিউনিটি তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের আড্ডা, বন্ধুদের নিয়মিত মিলনমেলা কিংবা সিনিয়র-জুনিয়রদের আন্তরিক সম্পর্ক এসবই একাকিত্ব কমাতে কার্যকর হতে পারে। মেসেজের বদলে মধ্যে মধ্যে সরাসরি ফোন করা কিংবা সপ্তাহে অন্তত একদিন বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি বসে গল্প করার অভ্যাসও সম্পর্ককে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক, গণগ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে। এমন জনপরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ শুধু হাঁটবে না, একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হবে, কথা বলবে এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
একাকিত্ব কোনো সাময়িক মন খারাপের নাম নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং জীবনমানকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবীকে এনে দিয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পাশের মানুষটির সঙ্গে দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাই এখনই সময় এই ডিজিটাল বুদবুদ থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসার। কারণ, স্ক্রিনের হাজারো লাইক-কমেন্টের চেয়ে বাস্তব জীবনের একটি আন্তরিক হাসি, একটি করমর্দন, কিংবা একজন প্রিয় মানুষের নিঃস্বার্থ খোঁজখবর এসবের মূল্য অনেক বেশি। এই সহজ অথচ গভীর সত্যটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, তত দ্রুত আমরা একটি আরও মানবিক, সহমর্মী ও মানসিকভাবে সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
আহমেদ রাফিদ
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়