প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জুলাই, ২০২৬
জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ ১৯৪৫ সালে যখন প্রকাশিত হয়, তখন এটি কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীর আখ্যানই তুলে ধরেনি, বরং উন্মোচন করেছিল ইতিহাসের এক গভীর ও তিক্ত ক্ষত। মাত্র ৩০ হাজার শব্দের এই সংক্ষিপ্ত উপন্যাসটি প্রকাশের আগে বহু বড় প্রকাশনা সংস্থার দ্বার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এমনকি একজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘এই গল্পটি এখন আর কারও আগ্রহের বিষয় নয়।’ কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, সেই কর্মকর্তা সম্পূর্ণ ভুল ছিলেন। প্রকাশের আট দশক পর আজও বইটি প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয় এবং অন্তত ৭০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই অসামান্য স্থায়িত্বের কারণ একটাই- অরওয়েল কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ঘটনার বর্ণনা দেননি; তিনি তুলে ধরেছেন ক্ষমতার এমন এক চিরন্তন মনস্তত্ত্ব ও মেকানিজম, যা যেকোনো দেশ ও যুগে সমানভাবে কার্যকর। ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’- বাংলার এই প্রবাদটি যেন উপন্যাসটির প্রতিটি পাতায় রক্তে-মাংসে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
অরওয়েলের এই বই লেখার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত কমিউনিজমকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। বিশেষ করে জোসেফ স্টালিন কীভাবে রুশ বিপ্লবের মূল আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এই উপন্যাসের কাহিনি। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর জারের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্টালিনের দীর্ঘ শাসনামলে (১৯২৪-১৯৫৩) প্রায় দুই কোটি মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। মস্কো ট্রায়াল, কুখ্যাত গুলাগ শ্রমশিবির এবং কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছিল অগণিত নিরীহ মানুষ। তবে এই উপন্যাসকে কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে মস্ত বড় ভুল হবে। রূপকের আড়ালে এই বই উন্মোচন করেছে মানবচরিত্রের অন্ধকার দিক, বিপ্লব হাতছাড়া হওয়ার ট্র্যাজেডি, ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব, সামাজিক পরিবর্তনের জটিল প্রক্রিয়া এবং স্বৈরাচারের নানাবিধ আখ্যান। ২০২৩ সালের এক একাডেমিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য- বিশ্বের ৮৫টি দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পতন ঘটেছে, যেখানে বিপ্লব বা পরিবর্তনের পর নতুন শাসকগোষ্ঠী সেই পুরোনো শোষণেরই পুনরাবৃত্তি করেছে। অরওয়েল বহু আগেই এই প্রবণতা আঁচ করতে পেরেছিলেন।
আজকের পৃথিবীতে এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার হাতবদল মানেই মুক্তি নয়। ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর অন্যতম ভয়ংকর আবিষ্কার হলো- কীভাবে ভাষা জনমত নিয়ন্ত্রণ ও কারসাজির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। উপন্যাসের মূল চরিত্র শূকর নেপোলিয়নের দোসর ‘স্কুইলার’ ছিল একজন অত্যন্ত দক্ষ প্রোপাগান্ডিস্ট। সে সত্যকে নিজের সুবিধামতো বাঁকিয়ে, জটিল ও দুর্বোধ্য পরিভাষা ব্যবহার করে এবং বিভ্রান্তিকর বর্ণনা ছড়িয়ে সবাইকে সর্বদা বিভ্রান্ত করত। বাস্তবেও এর হাজারো উদাহরণ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। ২০২২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্য সত্য খবরের চেয়ে চার থেকে ছয় গুণ দ্রুত ছড়ায়। উত্তর কোরিয়ার সরকার প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে প্রোপাগান্ডা তৈরিতে, যেখানে নাগরিকদের প্রতিনিয়ত বোঝানো হয় যে তাদের নেতা ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী। একইভাবে, মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকার টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে প্রচার করেছিল যে, গণতন্ত্র মূলত “বিশৃঙ্খলা” সৃষ্টি করে। আজকের ফেসবুক, টিকটক এবং এক্সের (সাবেক টুইটার) যুগে প্রোপাগান্ডা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বিপজ্জনক।
এখন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী তথ্য পরিবেশন করা হয়, যা তৈরি করে একেকটি ‘ইকো চেম্বার’। এর ফলে মানুষ শুধু সেই তথ্যই দেখে যা তাদের নিজস্ব বিশ্বাসকে সমর্থন করে এবং ভিন্নমতের প্রতি তারা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে পড়ে। মূলত ভাষার এই অপব্যবহারই স্বৈরাচারের প্রধান ভিত্তি। প্রোপাগান্ডার বাইরেও ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নির্মমভাবে উন্মোচন করা হয়েছে। উপন্যাসের ঘোড়া ‘বক্সার’ ছিল সবচেয়ে পরিশ্রমী; সে সব সময় বলত, “নেপোলিয়ন সর্বদা সঠিক” এবং “আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন সে অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন সেই নেপোলিয়নই তাকে কসাইখানায় বিক্রি করে দিল। ইতিহাসে বক্সারদের মতো ট্রাজিক চরিত্রের অভাব নেই। ২০১৯ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের ৫৮ শতাংশ মানুষ মনে করে বর্তমান গণতন্ত্র একটি “ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি”; অথচ তারা স্বৈরাচারকেও সমর্থন করে না। এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বের কারণ হলো- সাধারণ মানুষ নিরিবিলি বাঁচতে চায়, রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতে চায় না। বাংলাদেশে বিগত নির্বাচনগুলোয় ভোটারদের কম উপস্থিতি আমাদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের এক গভীর সংকটকেই নির্দেশ করে। চীনে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ার আন্দোলনের পর সরকার যে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। ফলে অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের মৌলিক অধিকার ত্যাগ করেছে। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, জনমানুষের নীরবতা বা উদাসীনতা আসলে শোষকের জন্যই সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়।
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- ক্ষমতার বিকৃতি বা দূষণ কীভাবে ঘটে। বইটিতে দেখা যায়, শূকররা প্রথমে ঘোষণা করেছিল: ‘সব প্রাণী সমান।’ কিন্তু ধীরে ধীরে তারা নিজেদের স্বার্থে সেই স্লোগান বদলে লেখে: ‘সব প্রাণীই সমান, তবে কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।’ ২০২১ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৬৮ শতাংশ দেশে দুর্নীতির মাত্রা ‘গুরুতর’ পর্যায়ে রয়েছে। ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে ২০১৯ সালে এক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন স্রেফ সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে। ভেনেজুয়েলায় ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি ৭৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে কেবল সরকারি সম্পদ নির্বিচারে লুটপাটের কারণে। অন্যদিকে ফিলিপাইনে মার্কোস পরিবার ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছিল, যা আজও দেশটির চরম দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ