ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মৃত্যুর উপত্যকা রোহিঙ্গা শিবির : পাহাড়ধস ও মানবিক সংকটের স্থায়ী ক্ষত

ওসমান গনি
মৃত্যুর উপত্যকা রোহিঙ্গা শিবির : পাহাড়ধস ও মানবিক সংকটের স্থায়ী ক্ষত

পাহাড় ধসে মানুষ মরার ঘটনা এটি শুধু আমাদের বাংলাদেশের জন্য নতুন ঘটনা নয়, প্রতিবছরই বৃষ্টির সময় এলে পাহাড় ধসে মানুষ মারা যায় কিন্তু তার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। মানুষ যখন পাহাড়ের উপর নির্বাচারে অত্যাচার চালায় তখনই পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর মানুষের তৈরি অরক্ষিত বাস্তবতার নিষ্ঠুর মেলবন্ধনে আরও একবার রক্তাক্ত হলো কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ আর মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে, ঠিক তখনই হুড়মুড় করে ধসে পড়ল পাহাড়ের ভারী মাটির স্তূপ। চোখের পলকে মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারালেন নারী ও শিশুসহ অন্তত আটজন মানুষ। বালুখালী, কুতুপালং, জামতলী আর জামশিয়ার চার-চারটি স্থানে ঘটে যাওয়া এই পৃথক বিপর্যয় আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল, উখিয়া-টেকনাফের এই বিস্তীর্ণ আশ্রয়শিবিরগুলো এখন শুধু সাময়িক মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং এক একটি বারুদহীন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ আর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হওয়া অতি ভারী বৃষ্টি এই ট্র্যাজেডির তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে, কিন্তু এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ও মানবিক সংকটকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা কেউ কোনো পরিসংখ্যানের নিছক সংখ্যা নন, প্রত্যেকেই ছিলেন এক একটি জীবন্ত স্বপ্নের ধারক। জামতলী শিবিরের ডি-৬ ব্লকে একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও তাদের চার বছরের অবুঝ সন্তানের প্রাণহীন দেহ যখন মাটির নিচ থেকে টেনে বের করা হচ্ছিল, তখন পুরো ক্যাম্পের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনদের আর্তনাদে। অন্যদিকে বালুখালীতে এক পরিবারের তিন ভাই-বোন ও তাদের আত্মীয়ের একসঙ্গে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। সাত বছরের শিশু একরাম বা তিন বছরের হারুনুর রশিদের তো দুনিয়ার এই জটিল সমীকরণ বোঝার বয়সই হয়নি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম সহিংসতা, জাতিগত নিধনযজ্ঞ আর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার নারকীয় উৎসব থেকে জীবন বাঁচাতে এই মানুষগুলো একদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, অন্তত প্রাণটুকু বাঁচল। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, নিজ দেশে বুলেটের হাত থেকে বাঁচলেও আশ্রিত দেশে তাদের পিষে দিল পাহাড়ের নির্মম মাটি। এই ট্র্যাজেডি আমাদের মানবিক বোধের দেয়ালে এক প্রচণ্ড আঘাত।

এই সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুলাংশে পূর্বাভাসযোগ্য বিপর্যয়। ২০১৭ সালে যখন মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৪টি আশ্রয়শিবির গড়ে তোলার অনুমতি দেয়। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৎকালীন সময়ে তাৎক্ষণিক আশ্রয় নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প হয়তো ছিল না। কিন্তু সবুজ অরণ্য ও পাহাড় কেটে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে এই বিশাল জনবসতি গড়ে তোলা হয়েছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতি বছর। গাছপালা ও বনের অনুপস্থিতিতে পাহাড়ের মাটির ভেতরের বাঁধন আলগা হয়ে গেছে বহু আগেই। তার ওপর পাহাড়ের খার্ডা ঢালু কেটে তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক আর বাঁশের ভঙ্গুর ঝুপড়ি ঘর। বর্ষা মৌসুমে যখন টানা কয়েক দিন ধরে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তখন পানি শোষণের ক্ষমতা হারিয়ে এই পাহাড়গুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়। উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার শঙ্কা এবং আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও কয়েক দিন বজায় থাকবে, যার অর্থ আরও হাজার হাজার জীবন এই মুহূর্তে সুতোয় ঝুলছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ চরম ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়, মাইকিং করা হয়, কিন্তু মূল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালুতে বসবাসকারী এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে? আশ্রয়শিবিরের সীমিত জায়গায় নতুন করে নিরাপদ আবাসন তৈরি করা অত্যন্ত দুরুহ। ভাসানচরে একটি অংশকে স্থানান্তরিত করা হলেও তা বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো। ফলে জীবনের ঝুঁকি জেনেও এই মানুষগুলোকে প্রকৃতির দয়ার ওপর ভরসা করে দিন কাটাতে হচ্ছে। প্রতি রাতের বৃষ্টি তাদের জন্য নিয়ে আসে মৃত্যুর পরোয়ানা, প্রতিটি মেঘের গর্জন তাদের মনে জাগিয়ে তোলে চাপা আতঙ্ক। দিনের পর দিন এই অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয় গ্রাস করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাধারণ মানুষকে, যা সামগ্রিক মানবিক নিরাপত্তাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে।

এই সংকটের সমাধান শুধু সাময়িক উদ্ধার তৎপরতা কিংবা নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গভীর রাতে কাদামাটি সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে। প্রথমত, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এবং আবহাওয়া দপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালুগুলোতে বসবাসরত পরিবারগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে বা অস্থায়ী শিবিরে সরিয়ে নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহায়তায় ক্যাম্পগুলোর ভেতরে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার জন্য পরিবেশবান্ধব প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল নির্মাণ, টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি বা ভূ-প্রাকৃতিক সংস্কারের কথা ভাবা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে নতুন করে ঘর তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি।

তবে সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যে উদারতা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। কিন্তু এই বিশাল জনসংখ্যার বোঝা এবং তার ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকালের জন্য বয়ে বেড়ানো অসম্ভব। কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ ধ্বংসের মুখে, স্থানীয় অধিবাসীরাও এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বার্ষিক মানবিক সাহায্য বা ত্রাণের তহবিল জোগানোর গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্থায়ীভাবে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে।

উখিয়ার এই পাহাড়ধস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি রাজনৈতিক বা সীমান্ত সমস্যা নয়, এটি একটি জীবন্ত মানবিক এবং পরিবেশগত ট্র্যাজেডি। আজ যে শিশুরা মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাল, তাদের এই মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না বিশ্ব বিবেকও। আমরা আর কোনো মায়ের কোল খালি হতে দেখতে চাই না, দেখতে চাই না বাঁশ আর পলিথিনের ঘরে ঘুমন্ত মানুষের ওপর পাহাড়ের নির্মম ধসে পড়া। প্রকৃতির এই প্রতিশোধ এবং মানুষের অসহায়ত্বের অবসান ঘটাতে হলে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত, সুদূরপ্রসারী এবং আন্তরিক উদ্যোগ। অন্যথায়, প্রতি বর্ষায় উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়গুলো এভাবে রক্তাক্ত হতেই থাকবে, আর আমরা হারিয়ে ফেলব মানবতার আরেকটি টুকরো অংশ। বিশ্বনেতৃত্বের ঘুম ভাঙাতে আর কতগুলো লাশের প্রয়োজন, এই প্রশ্ন আজ উখিয়ার আকাশ-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, উখিয়ার এই পাহাড়ধস শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি বিশ্ব বিবেকের নির্লিপ্ততা এবং একটি অমীমাংসিত মানবিক সংকটের করুণ বহিঃপ্রকাশ। নিজ দেশে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে যে মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছিল, আজ প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছেও তাদের এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে। সাময়িক উদ্ধারকাজে সামর্থ্য ও আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি না থাকলেও, ঝুঁকিপূর্ণ এই জনবসতিকে স্থায়ী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রতি বর্ষায় উখিয়ার মাটি এভাবে রক্তাক্ত হতেই থাকবে, যা সভ্য সমাজের জন্য এক স্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত