ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

খেলার মাঠে অন্ধ উন্মাদনা : বিনোদন যেন কেড়ে না নেয় অমূল্য প্রাণ

মো. রেজাউল করিম রনি
খেলার মাঠে অন্ধ উন্মাদনা : বিনোদন যেন কেড়ে না নেয় অমূল্য প্রাণ

খেলাধুলা মানবসভ্যতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। হাজার বছরের ইতিহাসে মানুষ খেলাকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই দেখেনি এটি ছিল আনন্দ, সুস্থ প্রতিযোগিতা, শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য, জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, হকি কিংবা অন্য যেকোনো খেলাই মানুষের হৃদয়ে বিশেষ আবেগের জন্ম দেয়। একটি ম্যাচ ঘিরে পরিবার, বন্ধু কিংবা পুরো একটি জাতি একই আনন্দে উদ্বেলিত হতে পারে। বিজয়ের উল্লাস মানুষকে একত্রিত করে, পরাজয় শেখায় ধৈর্য, আত্মসমালোচনা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, খেলাধুলার এই নির্মল আনন্দ আজ অনেক ক্ষেত্রেই সীমা অতিক্রম করছে। সুস্থ সমর্থনের জায়গায় জন্ম নিচ্ছে অন্ধ উন্মাদনা, অসহনশীলতা এবং আত্মবিধ্বংসী আবেগ। প্রিয় দলের জয় যেন জীবনের একমাত্র সাফল্য, আর পরাজয় যেন ব্যক্তিগত বিপর্যয় এমন মানসিকতা সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে খেলার মাঠে নয়, বরং খেলার বাইরেই ঘটছে সবচেয়ে বড় পরাজয় মানবতার, বিবেকের এবং জীবনের।

বিশ্বকাপ ফুটবল, মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো বড় আসর এলেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। বাড়ির ছাদে, অলিগলিতে, বাজারে, প্রতিষ্ঠানে উড়তে থাকে প্রিয় দলের পতাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, হাস্যরস, সমর্থন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এসবের অনেকটাই স্বাভাবিক এবং আনন্দের অংশ। কিন্তু যখন এই সমর্থন বিদ্বেষে রূপ নেয়, যখন একটি ম্যাচের ফলাফল মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, কিংবা একটি গোলের আনন্দ বা হতাশা কারও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন আমাদের থেমে প্রশ্ন করতেই হয়, আমরা কি সত্যিই খেলাকে ভালোবাসছি, নাকি আবেগের কাছে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি?

প্রায় প্রতি বড় টুর্নামেন্টেই সংবাদমাধ্যমে এমন খবর দেখা যায় প্রিয় দলের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে হৃদ্?রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, অতিরিক্ত মানসিক চাপে স্ট্রোক, আত্মহত্যার চেষ্টা কিংবা আত্মহত্যা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পতাকা টাঙাতে গিয়ে প্রাণহানি, বিজয় মিছিলে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে দুর্ঘটনা, এমনকি সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনাও। এসব খবর কয়েক দিনের আলোচনার পর হারিয়ে যায় কিন্তু একটি পরিবার চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলে তার প্রিয় মানুষটিকে।

প্রশ্ন হলো একটি খেলার জন্য কি সত্যিই একটি জীবন হারিয়ে যাওয়া উচিত? যে খেলোয়াড়দের জন্য আমরা এত আবেগে ভাসি, তারাও কি চাইবেন তাদের কোনো সমর্থক একটি ম্যাচের ফলাফলকে কেন্দ্র করে জীবন হারান? নিশ্চয়ই নয়। খেলোয়াড়রা প্রতিদিন পরিশ্রম করেন মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য, শোকের কারণ হওয়ার জন্য নয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ যখন কোনো দলকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেই দলের সাফল্যকে নিজের সাফল্য এবং ব্যর্থতাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে। এই মানসিক সংযুক্তি স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকলে তা আনন্দ দেয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। কিন্তু সেই সংযুক্তি যখন বাস্তবতা ভুলিয়ে দেয়, তখন জন্ম নেয় অন্ধ সমর্থন। তখন যুক্তি হারিয়ে যায়, সহনশীলতা কমে যায় এবং সামান্য একটি খেলার ফলও অসহনীয় মানসিক আঘাতে পরিণত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। একটি ম্যাচের আগে এবং পরে হাজার হাজার পোস্ট, ট্রল, ব্যঙ্গ, অপমান ও বিদ্রুপ সমর্থকদের আবেগকে অস্বাভাবিকভাবে উসকে দেয়। অনেকেই অনলাইন অপমান এড়াতে বা সামাজিক মর্যাদার ভয়ে একটি সাধারণ পরাজয়কেও অসহনীয়ভাবে গ্রহণ করেন। বাস্তবে একটি খেলা যেখানে বিনোদনের বিষয়, সেখানে সামাজিক চাপ সেটিকে অনেকের কাছে মানসিক সংকটে পরিণত করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অন্ধ উন্মাদনার শিকার হচ্ছে তরুণ সমাজ। কৈশোর ও তারুণ্যের আবেগ, পরিচয়বোধ এবং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় তাদের চরমপন্থী আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে দলের জন্য সবকিছু করা যায়। অথচ যে দলকে তারা ভালোবাসে, সেই দলের খেলোয়াড়রাই বারবার খেলাধুলায় শৃঙ্খলা, সম্মান, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেন।

আমাদের বুঝতে হবে, খেলার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করার মধ্যে নয় বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার মধ্যে। একটি ম্যাচের পরাজয় সাময়িক, কিন্তু একটি প্রাণহানি চিরস্থায়ী। ট্রফি একদিন এক দলের হাতে যায়, আরেকদিন অন্য দলের হাতে। কিন্তু একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সন্তান, বাবা, ভাই কিংবা বন্ধুকে আর কখনও ফিরিয়ে আনা যায় না।

তাই এখনই সময় নিজেদের প্রশ্ন করার আমরা কি খেলাকে উপভোগ করছি, নাকি খেলার নামে নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজকে অকারণ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি? খেলার প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই থাকবে কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন কখনোই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে। কারণ পৃথিবীর কোনো ট্রফি, কোনো জয় কিংবা কোনো বিশ্বকাপই একটি মানুষের জীবনের সমান মূল্যবান নয়।

মো. রেজাউল করিম রনি

সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত