ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কংক্রিটের শহরে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ

মোছা. সোমনা আক্তার
কংক্রিটের শহরে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ

একদিন হয়ত শহরের মানুষ গাছের ছায়া খুঁজবে, ঠিক যেভাবে আজ আমরা খুঁজে ফেরে একটু স্বস্তির বাতাস। তখন হয়ত রাস্তা থাকবে, দালান থাকবে, উড়ালসড়ক থাকবে- শুধু থাকবে না সেই গাছটি, যার নিচে দাঁড়িয়ে একসময় ক্লান্ত পথিক কয়েক মিনিটের জন্য স্বস্তি পেত। উন্নত শহর বানাতে গিয়ে আমরা কি এমন এক শহর তৈরি করছি, যেখানে মানুষ থাকার জায়গা পাবে, কিন্তু প্রকৃতি থাকার জায়গা পাবে না?

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্যে যাচ্ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করছে- অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি মানুষ এখন শহরের বাসিন্দা। দ্রুত ও অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শহরগুলোকে জনসংখ্যার এই চাপ সামলাতে হচ্ছে।

মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের জন্য শহরের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি সবুজের জায়গা সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে নগরায়ণ একসময় মানুষের জীবনযাত্রার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার সাম্প্রতিক চিত্র সেই আশঙ্কারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একটি গাছ শুধু গাছ নয়। এটি বাতাস থেকে দূষিত কণা শোষণে সহায়তা করে, ছায়া দেয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশে সহায়তা করে এবং পাখি- পতঙ্গসহ নানা প্রাণীর আশ্রয় তৈরি করে।

এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে মানুষের স্বাস্থ্যও- শুধু তাপ নয়, বায়ুদূষণ কমাতেও গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, আর সবুজের কাছাকাছি থাকা মানুষের মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ শহরের সবুজ কমে যাওয়া মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, বরং সরাসরি নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর আঘাত। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে নগরের সবুজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চরম তাপের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কিন্তু বাস্তবে শহরের তাপ কমানোর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই দুর্বল করে দিচ্ছি। গাছ কেটে সেখানে তৈরি হচ্ছে ভবন, ফুটপাত ও সড়ক। খোলা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে, জলাধার সংকুচিত হচ্ছে। কংক্রিট ও পিচের বিস্তারের ফলে শহর আরও বেশি তাপ ধরে রাখছে। গাছের ছায়াহীন ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মানুষ সেই তাপ সরাসরি অনুভব করছে।

সমস্যাটি শুধু ঢাকার নয়, দেশের অন্যান্য বড়ো শহরও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক ভবন, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের নকশায় যদি গাছ ও খোলা জায়গাকে বাধা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে একসময় শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হবে। উন্নয়ন আর সবুজায়ন যে একসঙ্গে চলতে পারে, তার একটি উদাহরণ সিঙ্গাপুর।

১৯৬৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ যখন ‘গার্ডেন সিটি’ গড়ার ঘোষণা দেন, তখন সিঙ্গাপুর ছিল একটি ঘনবসতিপূর্ণ, দ্রুত শিল্পায়িত হতে থাকা দ্বীপরাষ্ট্র-অনেকটা আজকের ঢাকার মতোই জায়গার সংকটে ভোগা এক শহর।

কিন্তু নগর পরিকল্পনার শুরু থেকেই সবুজায়নকে আলাদা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ গাছ, ভবনের ছাদ ও দেয়ালে উল্লম্ব বাগান, আর সুপরিকল্পিত পার্ক ব্যবস্থা- এসব মিলিয়ে সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে, ঘনবসতি আর সীমিত জমি থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত নগরায়ণে সবুজ ধরে রাখা সম্ভব। বাংলাদেশের শহরগুলোর জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টান্ত হতে পারে- প্রযুক্তি বা সম্পদের অভাব নয়, বরং নগর পরিকল্পনায় সবুজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছাই এখানে মূল বিষয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার- নগরায়ণ বন্ধ করার কথা কেউ বলছে না। বরং প্রয়োজন এমন নগরায়ণ, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি পাশাপাশি চলবে। একটা সড়ক তৈরি করতে গিয়ে পুরোনো গাছ কেটে ফেলতেই হবে- এমন ধারণা বদলাতে হবে। প্রকল্পের নকশা করার সময় গাছ ও সবুজ অঞ্চলকে হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। যেখানে সম্ভব, গাছ বাঁচিয়ে নকশা করতে হবে। শুধু নতুন চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

একটি পরিণত গাছের পরিবেশগত মূল্য একটি ছোট চারার চেয়ে অনেক বেশি। তাই বড়ো গাছ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো গাছ কাটার অনুমতি দেওয়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে দেখা এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন পরিবেশগত মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে নীতিগত দুর্বলতার কথাও বলা দরকার। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন গাছ কাটা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন ছিল না। ২০২৩ সালে মন্ত্রিপরিষদ নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০৩০ সাল পর্যন্ত অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা যাবে না- কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত প্রায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে, কারণ গাছ কাটার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান ছিল না। সম্প্রতি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ’ জারি হয়েছে, যাতে সংরক্ষিত বা বিপদাপন্ন ঘোষিত গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এখনও এর আওতা মূলত সরকারি বন, সামাজিক বন ও গণপরিসরের গাছে সীমাবদ্ধ। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বা বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গাছ নিধন এখনও অনেকটাই আইনি ফাঁকের মধ্যে থেকে যাচ্ছে।

এ অধ্যাদেশ কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়, নজরদারি ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায়- তার ওপরই নির্ভর করবে এর প্রকৃত প্রভাব। প্রয়োজন এমন একটি সুসংহত জাতীয় নীতিমালা, যেখানে নগর উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদনের পূর্বশর্ত হিসেবেই পরিবেশগত মূল্যায়ন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক থাকবে। শহরের খেলার মাঠ, পার্ক, উদ্যান ও জলাধারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। এসব জায়গা দখল বা অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে বাগান, সড়কের পাশে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং উল্লম্ব সবুজায়ন শহরের সবুজ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

তবে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। একটি গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার চেয়ে সেই গাছটি কয়েক বছর বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও তরুণদের সমন্বিত উদ্যোগে নিজ নিজ এলাকার গাছ ও সবুজ স্থান রক্ষার সংস্কৃতি তৈরি করা যেতে পারে। নগরায়ণ থামবে না। মানুষ শহরে আসবে, নতুন ভবন হবে, নতুন সড়ক হবে। কিন্তু সেই উন্নয়নের সঙ্গে যদি সবুজ হারিয়ে যায়, তাহলে একদিন আমাদের শহর হয়ত আরও বড়ো হবে, আরও ব্যস্ত হবে- কিন্তু আরও বাসযোগ্য হবে না।

তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আমরা কি এমন শহর চাই, যেখানে আকাশের দিকে তাকালে শুধু কংক্রিট দেখা যাবে? নাকি এমন শহর চাই, যেখানে উন্নয়নের মধ্যেও গাছের ছায়া থাকবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত