প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সৃষ্টির সূচনা থেকেই পৃথিবী হলো বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি। আদিগন্ত বিস্তৃত বনাঞ্চল, সুবিশাল মহাসমুদ্র, পাহাড়ি নদী আর তার কোলে গড়ে ওঠা কোটি কোটি প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সম্মিলিত সান্নিধ্যেই রচিত হয়েছে জীবনের রঙিন ক্যানভাস। এ সুবিশাল প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য বা জীববৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, বরং পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতার মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
প্রকৃতির এ সুবিন্যস্ত মহাশৃঙ্খলে অণুজীব থেকে শুরু করে বিশালকায় নীল তিমি, প্রতিটি জীবেরই রয়েছে নির্দিষ্ট ও অপরিহার্য ভূমিকা। অথচ আধুনিক সভ্যতার অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ, প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ এবং পরিবেশ দূষণের ফলে আজ এ ভারসাম্য চরম হুমকির মুখে। বাস্তুতন্ত্রের কোনো একটি সুতো ছিঁড়ে গেলে তা সমগ্র প্রাণিকুলের টিকে থাকাকেই অনিশ্চিত করে তোলে। তাই প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
মহাবিশ্বের বিশালতায় পৃথিবীই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান একমাত্র গ্রহ, যেখানে জীবনের স্পন্দন ছড়িয়ে রয়েছে পরম মমতায়। এ জীবনের স্পন্দন কোনো একক অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি গড়ে উঠেছে লক্ষ-কোটি প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব এবং তাদের চারপাশের পরিবেশের এক জটিল, সুবিন্যস্ত ও সৌন্দর্যময় সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। এ বৈচিত্র্যময় জীবনব্যবস্থাই হলো জীববৈচিত্র্য। মানবজাতিসহ সমস্ত প্রাণিকুলের টিকে থাকা মূলত এ বৈচিত্র্যের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। অথচ আধুনিক সভ্যতার অন্ধ প্রতিযোগিতায় আমরা প্রতিদিন ভুলে যাচ্ছি যে, প্রকৃতির এ বিশাল বুননে কোনো একটি সুতো ছিঁড়ে গেলে পুরো পোশাকটিই একদিন খুলে পড়তে বাধ্য। প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষা শুধু একটি নৈতিক আবেগ নয়, এটি হলো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং পৃথিবীর টিকে থাকার একমাত্র পরম শর্ত।
প্রকৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন একক সত্তা নয়, এটি একটি মহাশৃঙ্খল। একটি বনের বিশাল বৃক্ষ থেকে শুরু করে মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকা অনুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়া, সবাই মিলে গড়ে তোলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। উদাহরণ হিসেবে আমরা মৌমাছি বা কীটপতঙ্গের কথা ভাবতে পারি। দেখতে ছোট মনে হলেও এই পতঙ্গদের পরাগায়ণ প্রক্রিয়ার ওপরেই নির্ভর করে পৃথিবীর সিংহভাগ খাদ্যশস্যের উৎপাদন। যদি কোনো কারণে কীট-পতঙ্গের এই বৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়, তবে উদ্ভিদজগতে পরাগায়ন বন্ধ হবে, ফলে ফলমূল ও খাদ্যের উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। খাদ্যশস্যের অভাব পরবর্তীতে তৃণভোজী প্রাণী থেকে শুরু করে মাংসাশী প্রাণী এবং অবশেষে মানবজাতিকে চরম খাদ্যাভাবের দিকে ঠেলে দেবে। এভাবেই একটি মাত্র প্রজাতির বিলুপ্তি সমগ্র প্রাণিকুলের অস্তিত্বকে টলমল করে তুলতে পারে।
জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে প্রাণীর অস্তিত্বের সম্পর্ক শুধু খাদ্যের চাহিদায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের মৌলিক ভারসাম্য রক্ষাতেও সমানভাবে ভূমিকা রাখে। বিশাল প্রাকৃতিক বনভূমি, নদী-নালা, সমুদ্র ও জলাভূমি পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঠিক সমতা বজায় রাখে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল প্রাচীর ও প্লাঙ্কটন পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর কার্বন শোষণ করে।
কিন্তু শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট উষ্ণায়ন, প্লাস্টিক দূষণ এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের মিশ্রণে যখন সমুদ্রের সেই জীবন চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন কেবল সামুদ্রিক প্রাণীই বিপন্ন হয় না, বরং পুরো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঘটে বিষাদময় পরিবর্তন। ডাঙ্গা এবং জলের প্রতিটি বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ এ বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। তাদের বাদ দিয়ে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রজাতি হয়ে পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব।
আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানব স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো প্রকৃতি। আমরা যেসব জটিল রোগের প্রতিষেধক তৈরি করি, তার অধিকাংশ সূত্র আসে বন্য উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন প্রাণীর শরীরের জৈবিক উপাদান থেকে।
বিভিন্ন অণুজীব এবং বন্য প্রাণীর ওপর গবেষণা চালিয়ে মানুষ অসংখ্য মরণব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। যখন কোনো একটি প্রজাতি প্রকৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সম্ভাব্য ওষুধের সন্ধান, যা হয়তো ভবিষ্যতে মানবকুলকে বা অন্য কোনো প্রাণীকে বড় কোনো মহামারি থেকে বাঁচাতে পারত। তদুপরি, বন্য পরিবেশ যখন সংকুচিত হয় এবং বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্য নষ্ট হয়, তখন প্রাণীবাহিত ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
বন্যপ্রাণীদের নিজস্ব আবাস্থল ধ্বংস করার ফলেই জঙ্গল ছেড়ে রোগজীবাণু মানুষের লোকালয়ে চলে আসে, যা বিশ্বব্যাপী প্যান্ডেমিক বা মহামারির রূপ নেয়। সুতরাং, প্রকৃতির নিজস্ব সীমানা এবং বৈচিত্র্য রক্ষা করা আসলে প্রাণিকুলকে মহামারীর ছোবল থেকে রক্ষা করারই নামান্তর।
বিগত কয়েক শতাব্দীতে মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর অসংখ্য প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নগরায়ণ, বন উজাড়করণ, অতিরিক্ত কৃষিজমি তৈরি এবং অবাধ শিকারের ফলে প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রজাতি তার প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। নদীর গতিপথ বদলে দেওয়া, জলাভূমি ভরাট করা এবং জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি ও জলের যে বাস্তুতন্ত্র, তা বিষাক্ত হয়ে উঠছে। মাটির ভেতরের ক্ষুদ্র অণুজীব ধ্বংস হলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, যার প্রভাবে সমগ্র অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনসংকট দেখা দেয়। মানুষ ভেবেছিল সে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রকৃতিকে জয় করেছে, কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা কোনো প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি বিলুপ্ত প্রাণীকে আর কোনো রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে নতুন করে জীবন দান করা যায় না।
জীববৈচিত্র্যের অবনতি শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বন ও জলজ পরিবেশের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্যজীবী, বনাঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল গোষ্ঠী, এমনকি আধুনিক কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি— সবটাই দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতির দেওয়া সম্পদের ওপর।
যখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন দেখা দেয় খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং মাটির ক্ষয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষিতে, শুরু হয় খাদ্য সংকট এবং বাস্তুচ্যুত হয় হাজার হাজার মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আজ প্রাণিকুলকে নিজস্ব বাসস্থান ছেড়ে এক অনিশ্চিত আশ্রয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাণীর টিকে থাকার এ পথরুদ্ধ হয়ে গেলে সামাজিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও তার ভয়াবহ অভিঘাত পড়ে।
প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের চিন্তাধারায় এক মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রকৃতিকে শুধু একটি 'সম্পদ' হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে, যা মানুষ ইচ্ছামতো ব্যবহার ও শোষণ করতে পারে। প্রকৃতি হলো একটি অংশীদার, যার সুস্থতার ওপর মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে। বিশ্বজুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল গড়ে তোলা, বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা এবং সর্বাগ্রে প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, আমাদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে টেকসই বা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। ক্ষতিকারক কীটনাশক বর্জন করে জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া বনাঞ্চল পুনর্বাসনের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতিকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারি।
জীববৈচিত্র্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সামগ্রিক সচেতনতার গভীরে। প্রতিটি দেশের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে ব্যক্তিম্পর্যায়ে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, পৃথিবীর প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। শিশু ও তরুণদের পাঠ্যক্রমে পরিবেশের এ আন্তঃসম্পর্কের বিষয়গুলো গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যেন তারা আত্মকেন্দ্রিক মানবকেন্দ্রিক ভাবনার বাইরে গিয়ে সমগ্র প্রাণের প্রতি সহমর্মী হতে শেখে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যারা যুগে যুগে ধরে প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করে বনাঞ্চল রক্ষা করে আসছে, তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে সংরক্ষণ নীতির অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
অবশেষে, এটি স্বীকার করার সময় এসেছে যে প্রকৃতি মানুষকে ছাড়া দিব্যি বেঁচে থাকতে পারবে, কিন্তু মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী প্রকৃতি ও তার বৈচিত্র্য ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারবে না। মহাবিশ্বের এই নিঃসঙ্গ নীল গ্রহটিতে জীবনের যে অসাধারণ ক্যানভাস তৈরি হয়েছে, তার প্রতিটি প্রজাতিই এক একটি অনন্য তুলির টান। কোনো একটি রং মুছে গেলে ক্যানভাসের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনই জীবনের পূর্ণতাও হারিয়ে যায়। প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইটি তাই মূলত আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এ লড়াইয়ে হেরে গেলে বিজয় লাভ করার মতো কোনো জয়ী পক্ষ অবশিষ্ট থাকবে না। ধরণীর এ বিচিত্র প্রাণস্পন্দনকে রক্ষা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সবুজ ও সহনশীল পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের একমাত্র ব্রত।
পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা কোনো বিলাসী ভাবনা নয়, বরং মানবজাতির টিকে থাকার মৌলিক পূর্বশর্ত। প্রকৃতিকে জয় করার দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে আমাদের এর সহযাত্রী হতে হবে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা, প্রাকৃতিক আবাস্থল রক্ষা করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমরা যদি আজ প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময় জীবনচক্রকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তবে কাল নিজেদের অস্তিত্বকেই চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেব। তাই আগামীর বাসযোগ্য, সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে সুসংহত পদক্ষেপ গ্রহণ করার এখনই উপযুক্ত সময়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।