প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস। ঘাস পরিবারের বৃহত্তম এ সদস্য শুধু প্রকৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৈশ্বিকভাবে বাঁশ শিল্পের উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৫ সালে বিশ্ব বাঁশ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ৮ম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেসে প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 'বিশ্ব বাঁশ দিবস ২০২৬'-এর অফিসিয়াল প্রতিপাদ্য বা থিম হচ্ছে— Bamboo Beyond Borders. সহজ বাংলায় বলতে গেলে 'বৈশ্বিক সীমানা ছাড়িয়েছে বাঁশ'। তাই বলা যায় বাঁশ একটি আর্ন্তজাতিক উদ্ভিদ। এ বছর পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঁশ দিবসের ১৮তম আয়োজন।
'বাঁশ 'বাংলাদেশে এ শব্দটাই বেশ সংবেদনশীল এবং নেতিবাচক উপমায় ব্যবহার হয়। বাঁশ দিবসকে প্রথম দেখায় ভুল করে কেউ কেউ বাঁশ দেওয়া দিবস মনে করতে পারেন। বাঙালির জীবনে বাঁশের ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার এত বেশি যে, 'কাউকে বাঁশ দিয়েছি', 'বাঁশ খেয়েছি' এ সরল স্বীকারক্তিগুলো একেবারে প্রবাদ পর্যায়ে চলে গেছে। তবে বাঁশ দেওয়া— বাঁশ খাওয়া শব্দটি শুধুমাত্র বাংলাতেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। উপরন্তু জনপ্রিয় চাইনিজ প্রবাদ, Like Bamboo, the higher you grow, the lower you bow থেকে আমরা বলতে পারি, বাঁশ আমাদের বিনয় শিক্ষা দেয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শুধু বাঁশ দেওয়া-নেওয়া চললেও সত্যিকার অর্থে বাঁশের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম।
বাঁশ আমাদের চির পরিচিত বনজ সম্পদ। বাঁশ হলো 'পোয়াসি' গোত্রভুক্ত এক ধরণের বৃক্ষসদৃশ ঘাস। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা দীর্ঘাকৃতির, বিস্তৃত এবং বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী; এর বৈশিষ্ট্য হলো প্রতি বছর নতুন কাণ্ড বা বাঁশ গজানোর ক্ষমতা। পরিবেশবান্ধব হওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে জৈব-ভর উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও ভূমিক্ষয় রোধে ভূমিকা রাখার কারণে এটি কাঠের একটি সহজ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। বাঁশের সঙ্গে আমাদের আদিবাসী— সংস্কৃতির সম্বন্ধ সেই আদিকাল থেকে। শিল্পকাজে, ব্যবহারিক জীবনে, খাদ্য সামগ্রী ও ভেষজগুণে বাঁশের চাহিদা সারা বিশ্বে ক্রমর্বধমান। পৃথিবীব্যাপী বাঁশের চাষাবাদ যেমনি বাড়ছে, তেমনি প্রতিনিয়ত বাঁশ নিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ উন্নতমানের দৃষ্টিনন্দন শিল্পসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে বাড়ছে বাঁশজাত পণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও। বর্তমান বিশ্বে বাঁশের বাজার প্রায় শত বিলিয়ন ডলারের, যেটা অদূর ভবিষ্যতে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বাঁশের ব্যবহার : বাঁশ ও বাঁশজাত দ্রব্যের ব্যবহার ব্যাপক। বাঁশ থেকে বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৮০টি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে বাঁশের ব্যবহার হয়ে আসছে। টমাস আলভা এডিসন যে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন সেখানে তিনি বাঁশের ফিলামেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। আস্ত বাঁশের বৃহৎ নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে চেরাইকৃত বাঁশের অতি ক্ষুদ্র নির্মাণ, বয়ন ও কারুশিল্প তথা হস্তশিল্প পর্যন্ত বাঁশের বিস্ততি। বিশ্বের যেসব দেশে ও যেসব অঞ্চলে বাঁশ জন্মে ও জন্মানো হয় সেসব দেশে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার রয়েছে।
নবজাতকের নাড়ি কাঁটা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়াতে অনেকেই প্লাস্টিকসহ কৃত্রিম জিনিস বর্জন করছে। প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ ব্যবহার করে নিত্য প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে হু হু করে অভিনব ক্ষুদ্র শিল্প দ্রব্যের উদ্ভাবন হচ্ছে। এমনিতেই উন্নত বিশ্বে প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ থেকে হস্তশিল্পের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত দ্রব্যের দারুণ চাহিদা রয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পের মতো এ শিল্পের বিশ্ববাজারে প্রবেশের শুভ দ্বারটি আমাদের জন্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
এ ধরনের শিল্পে সামান্য পরিমাণ বাঁশ ব্যবহার করেই অনেক অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। এ শিল্পের প্রধান বিনিয়োগ শুধুমাত্র দক্ষ বয়ন কারিগরদের পারিশ্রমিক। সে বিবেচনায় আমাদের উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক হবে।
নির্মাণ : বাংলাদেশে বছরে শুকনো বাঁশের চাহিদা অন্তত ১০-১৫ লাখ টন। ২০১৭ সালের পর থেকে কক্সবাজারের শরণার্থী বসতিগুলোতে নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি বাঁশের খুঁটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাঁশের নানাবিধ ব্যবহারের মধ্যে নির্মাণকাজে সবচেয়ে বেশি বাঁশের প্রয়োজন। চাহিদা থাকায় পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় বাঁশের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামে উন্নত বাড়িঘর নির্মাণে বাঁশ বেশ টেকসই উপাদান। বিশেষ করে কাঁচা বাড়ির ভিত দেয়াল ও ছাদ তৈরিতে বাঁশের পাটাতন ও ফ্রেম ব্যবহার হয়। বাঁশের পাতায় ঘরের ছাউনি হয়। আবার পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ দিয়েই তোলা হয় মাচার ঘর। গ্রামের লোকজন ছোট খাল পার হতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ দিয়ে সেতু বানিয়ে থাকেন। কারণ অল্প টাকায় এর চাইতে মজবুত ও টেকসই সেতু গড়া সম্ভব না। এ ছাড়া বেড়া তুলতে বা বন্যার সময় আশ্রয়ের জন্য মজবুত মাচা তুলতেও বাঁশ লাগে।
বাঁশের মধ্যে সেলুলোজের পরিমাণ ৭৪ শতাংশ যেখানে সাধারণ কাঠে থাকে ৪০-৪৪ শতাংশ। এজন্য বাঁশে দ্রুত ঘুণে ধরে যায়। তবে বাঁশকে যদি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তবে ৫০ বছর বা ততোধিক সময় বাঁশকে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।
বাঁশ ও ইস্পাত দিয়ে 'ক্ষুদি বাড়ি' তৈরি করে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার -২০২৫ অর্জন করে। আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার ২০২৫ুএর ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিচারকমণ্ডলী ক্ষুদি বাড়ি প্রকল্পের গভীর পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। একই সঙ্গে বাঁশকে বৈশ্বিক অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারার একটি উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁরা।
প্রকৃতি-পরিবেশ ও প্রাণ রক্ষায় : প্রকৃতি-পরিবেশ ও প্রাণ রক্ষায় বিশেষ করে, দুর্যোগ মোকাবেলা, পাহাড় ধস, ভূমি ক্ষয়, নদীভাঙন রোধসহ জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না। বাঁশ অন্যান্য গাছগাছালির চেয়ে ২০-৩৫ শতাংশ বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে আর বেশি মাত্রায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। ফলে বাতাস বিশুদ্ধ থাকে। বলা হয় বাঁশঝাড় আশপাশের তাপমাত্রাকে ৫ থেকে ৮ ডিগ্রী পর্যন্ত ঠান্ডা রাখতে সক্ষম। ফলে এটা অনেকটা প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনার হিসাবে কাজ করে।
মাটি রক্ষা : বাঁশ গাছের শেকড় ছড়ানো থাকায় এটি মাটি ভাঙন রোধ করে, মাটির ঢালকে মজবুত করে, ফলে পাহাড় ধস ঠেকানো যায়, ভারী ধাতু শোষণ করে মাটির ক্ষয় রোধ করে, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী আশ্রয় নিতে পারে। এক কথায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ঠেকাতে বাঁশের গুরুত্ব রয়েছে। বাঁশ এমনকি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে টেনে তোলে।
দুর্যোগ থেকে রক্ষা : ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকেও বসত-ঘরকে রক্ষা করে বাঁশ। এ কারণে গ্রামে বসতবাড়ির পাশে বাঁশঝাড় দেখা যায়। জাপানে প্রচুর বাঁশের ঘর দেখা যায়। কারণ এসব ঘর ভূমিকম্প সহনীয়। ভূমিকম্পের সময় বাঁশঝাড়ে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
বাঁশ কোড়ল ও বাঁশ পাতার চা : খাদ্য হিসেবেও বাঁশ ব্যবহৃত হচ্ছে। পুষ্টি উপাদান ও মুখরোচক স্বাদের জন্য পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে খাবার বাঁশ কোড়ল নামে পরিচিত। এর তৈরি স্যুপ, সালাদ, তরকারি বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত বাঁশের অঙ্কুরোদগম হওয়ার পর চার থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত যে কচি বাঁশ হয়— সেটাই রান্না করে খাওয়া যায়।
বাঁশের পাতার নির্যাস থেকে এক প্রকার পানীয় তৈরি করা হয়, যেটা 'ব্যাম্বো লিফ টি' নামে পরিচিত। বাঁশ পাতার চা হলো ক্যাফেইন-মুক্ত একটি ভেষজ পানীয়, যা প্রাকৃতিক সিলিকা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজ উপাদানে ভরপুর। এগুলো চুল, ত্বক, নখ ও হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে। বাঁশপাতা হলো জৈবিকভাবে শোষণযোগ্য সিলিকার অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উৎস। সিলিকা কোলাজেন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে, যা ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে, ভঙ্গুর নখকে মজবুত করতে এবং চুল ভাঙা কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা উচ্চ মাত্রার সিলিকা ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড়ের শক্তি বজায় রাখে এবং বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয় রোধ করতে সহায়তা করে। পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, সেদ্ধ করা বাঁশ পাতায় ফাইবার, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, পটাসিয়াম, ভিটামিন ই, আয়রন পাওয়া যায় যা শরীরকে চাঙ্গা রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফাইবার থাকায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্যে উপশম দেয় এবং হজমশক্তি বাড়ায়।
নিত্য ব্যবহার্য পণ্য ও হস্তশিল্প : প্রাচীনকাল থেকেই বাঁশের চেরাইকৃত পাতলা খণ্ডাংশ বয়নের মাধ্যমে চাটাই ও দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ব্যবহার্য দ্রব্য এবং চেরাইকৃত সরু শলাকা লতা ও আঁশের গ্রন্থনে নানা ধরনের মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি হয়ে আসছে। অধুনা দেশে বিদেশে এ হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। ফলে বাঁশ থেকে স্বাস্থ্যকর ল্যামিনেটেড বাঁশের মেঝে ও দেয়াল কভার, মাদুর, কুশন, সিট কভার, এমনকি পাদুকা পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। আসবাবপত্র, বাদ্যযন্ত্র, রান্নাঘরের বিভিন্ন সরঞ্জাম যেমন কুলো, ডালা, ঝুড়ি, চাঁটাই, প্লেট, বাটি, চামচ, স্ট্র সেইসঙ্গে কৃষি সরঞ্জাম, তোরণ, প্যান্ডেল তৈরি, ল্যাম্প, জামাকাপড়ের হ্যাঙ্গার, ল্যাপটপের কেসিং, ইত্যাদি নানা ধরনের পণ্য বানাতে বাঁশ দরকার হয়। বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প পরিবেশবান্ধব, যা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এগুলো সাধারণত দামে সস্তা হয় আবার রপ্তানি করে আয়ের সুযোগও থাকে।
জ্বালানি, বস্ত্র ও কাগজ শিল্পে ব্যবহার : সুতা ও কাগজ তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার অনেক আগে থেকে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বাঁশের তন্তু দিয়ে টুপি, স্কার্ফ, গ্লাভস, মোজা ও প্যান্ট তৈরি হচ্ছে। সেইসাথে বিভিন্ন ধরনের কাগজ, টয়লেট পেপার তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে বাঁশ। সভ্যতার ক্রমউন্নয়নে বাঁশ থেকে পার্টিকেলবোর্ড, প্লাই বা ফ্লেকবোর্ড, বাঁশ থেকে ঢেউটিন ও প্যানেল পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ও কাঠ কয়লায় বাঁশের ব্যবহার ব্যাপক।
ওষুধ ও প্রসাধনী : বাঁশের মধ্যে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ থাকায় এটি এখন শ্যাম্পু, ক্রিমসহ নানা ধরনের প্রসাধনীসহ পোকামাকড় প্রতিরোধকের মতো পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী বাঁশ : বিশ্বে বাঁশ বনের মোট আয়তন প্রায় ৩৬ মিলিয়ন হেক্টর, যা মূলত এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, আমেরিকা এবং আফ্রিকার বাঁশ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে বিস্তৃত। তবে পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাঁশ বনের বৃহত্তম এলাকা রয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাঁশের প্রজাতি এখানেই পাওয়া যায়।
সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীতে (নাতিশীতোষ্ণ, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং বিরুৎ-জাতীয়) ১৩৯টি গণের অধীনে ১৮২১টি স্বীকৃত বাঁশের প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে চীনে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭০০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। ২য় অবস্থানে প্রতিবশেী দেশ ভারত। চীনের সভ্যতায় বাঁশকে শুভশক্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। একারণে চীনা সংস্কৃতির সর্বত্র রয়েছে বাঁশের ব্যবহার। তারা মনে করে বাঁশ নেগেটিভ এনার্জিকে প্রতিহত করতে পারে।
চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ বাঁশের ব্যবহার শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বাঁশের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে অসাধারণ সব হস্তশিল্প ও স্থাপত্য নির্মাণশৈলী তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের বিজ্ঞানীরা বাঁশের সেলুলোজ থেকে প্রোট্রোলিয়াম প্লাস্টিক উদ্ভাবন করেছেন যেটি মাত্র ৫০ দিন মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
বাঁশ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাংশে, মোটামুটি ২০ক্ক ৭৫ক্ম উত্তর এবং ২৫ক্ক৭৫র্ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ দেশে সাধারণত ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু বিরাজ করে। বাংলাদেশ মূলত একটি সমতল ভূমির দেশ। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়া দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের উঁচু ভূমি বা টিলা-অঞ্চল বাদে বাকি অংশ নিচু, সমতল ও উর্বর ভূমিতে গঠিত। ফলে এখানকার মাটি ও জলবায়ু বাঁশের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। সারা দেশে বাঁশের প্রায় ৯টি গণ ও ৩৩টি প্রজাতি জন্মে থাকে। গত ১৫ বছরে দেশে মোট বাঁশবাগানের ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির পুনরুদ্ধার সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উজাড়ের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বাঁশবাগান। একসময় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা বাঁশবাগান এখন দ্রুত কমে আসছে। এ অবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পরিবেশবাদী ও বন বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৫ বছরে দেশে মোট বাঁশবাগানের ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির পুনরুদ্ধার সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উজাড়ের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে বাঁশবাগান। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতি সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের বন উজাড়ের ফলে দেশের বাঁশসম্পদ ধীরে ধীরে কমছিল। তবে প্রকৃত মোড় পরিবর্তন ঘটে ২০১৭ সালে, যখন মিয়ানমারে ব্যাপক সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন গড়ে তোলা হয় মূলত বাঁশের তৈরি ঘরের মাধ্যমে। ফলে সে সময় দেশে বাঁশের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এরপর থেকে প্রতি বছর অন্তত দুই কোটি বাঁশের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাবে দেশের বাঁশবাগানের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
বাংলাদেশের মাটি, মৌসুমি জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান বাঁশের জন্যে আদর্শ স্থান। তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও নির্বিচারে বাঁশ উজাড় করায় প্রকৃতির এ মূল্যবান সম্পদ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। পৃথিবীর ৮০ ভাগ বাঁশই এশিয়া মহাদেশে জন্মে। তবে বর্তমানে ইউরোপ ও আফ্রিকাও বাঁশের পেছনে ছুটছে। কারণ বাঁশ জন্মানো সহজসাধ্য, অন্যান্য বনজ সম্পদের চেয়ে লাভজনক ও এর বহুবিধ ব্যবহার। মাটির ওপর দণ্ডায়মান এ খাড়া উদ্ভিদ সামান্যতম জায়গা দখল করে অনেকগুণ অর্থকরী ফসল প্রদান করে। একই সঙ্গে পতিত জমি আবাদযোগ্য করে তোলে, ভূমির ক্ষয়রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণের উপাদান হিসেবে সহজেই সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলে। বাঁশ অন্য যে কোনো উদ্ভিদের চেয়ে বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে ও বেশি পরিমাণ র্কাবন শোষণ করে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমান সরকারের যে ২৫ কোটি গাছ লাগানো প্রকল্প এর মধ্যে অন্যান্য গাছের পাশাপাশি অন্তত কয়েক কোটি বাঁশ রোপণ প্রয়োজন। সবাইকে বিশ্ব বাঁশ দিবসের শুভেচ্ছা।
লেখক : কিউরেটর, কোয়ান্টাম ব্যাম্বোরিয়ান