ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিকড়ের তিন দশক : সংস্কৃতির আলোয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

শিকড়ের তিন দশক : সংস্কৃতির আলোয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় শুধু তার একাডেমিক সাফল্য, গবেষণা কিংবা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণও থাকে তার মানুষের মধ্যে, তার চিন্তায়, তার সাংস্কৃতিক চর্চায়। সেই চর্চা কখনও মঞ্চে দৃশ্যমান হয়, কখনও কবিতার পংক্তিতে, কখনও গানের সুরে, আবার কখনও নিভৃতে তৈরি হয় একজন তরুণের চিন্তার ভেতর। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন 'শিকড়' দীর্ঘদিন ধরে সেই পরিসরটি তৈরি করে আসছে। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি এখন ত্রিশের দ্বারপ্রান্তে নয়, বরং ত্রিশের মাইলফলক অতিক্রমের মুহূর্তে।

এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজন্ম বদলেছে বহুবার। ক্যাম্পাসের দৃশ্যপট বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক রুচিতেও এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু একটি বিষয় একই থেকেছে— নিজেকে প্রকাশ করার এবং অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষা।

'শিকড়'-এর দীর্ঘ পথচলার তাৎপর্য এখানেই। সংস্কৃতির প্রয়োজন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এর গুরুত্ব বারবার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি, ফলাফল ও দক্ষতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকতে হয়। এসব প্রয়োজনীয়; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কর্মজীবনের প্রস্তুতিমঞ্চ নয়। এটি একজন মানুষকে বৃহত্তর সমাজের জন্য প্রস্তুত করারও জায়গা। সংস্কৃতি সেই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটি কবিতা একজন তরুণকে অনুভব করতে শেখাতে পারে। একটি নাটক তাকে অন্যের অবস্থান থেকে পৃথিবী দেখতে শেখাতে পারে। একটি গান তাকে নিজের অনুভূতির ভাষা খুঁজে দিতে পারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চা তাকে শেখাতে পারে সহযোগিতা, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। এসবের কোনোটি পরীক্ষার খাতায় মাপা যায় না, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে এগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক পরিসরের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগকে দ্রুত করেছে; কিন্তু মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও মূল্যবোধের বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে যে একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, সেখানে সংস্কৃতি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। তবে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিজেই তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। 'শিকড়'-এর ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক— নতুন প্রজন্মের কাছে সংগঠনটি কতটা প্রাসঙ্গিক? বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট, নতুন সংগীতধারা এবং পরিবর্তিত জীবনযাপন তাদের রুচি ও প্রকাশভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে। এই পরিবর্তনকে পাশ কাটিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে পুরোনো কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার অর্থ তাই অতীতকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং অতীতের মূল্যবোধকে ধারণ করে সময়ের সঙ্গে নতুন ভাষা তৈরি করা। এ জায়গায় 'শিকড়'-এর সামনে রয়েছে বড় সম্ভাবনা। সংগঠনটি তার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতাকে আরও বেশি জায়গা দিতে পারে। ক্যাম্পাসের প্রচলিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি নতুন মাধ্যম ও নতুন প্রকাশভঙ্গিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সমাজের সঙ্গেও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। কারণ সংস্কৃতি কখনও শুধু ক্যাম্পাসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের মানুষের জীবন, তাদের আনন্দ-বেদনা, বৈষম্য, স্বপ্ন, হতাশা, সংগ্রাম— সবই সংস্কৃতির বিষয়। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তার সময় ও সমাজকে যত বেশি ধারণ করতে পারে, তার কাজ তত বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। এখানে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অতীতের অর্জন নয়; বরং নতুনদের হাতে সেই অর্জন কতটা নিরাপদ ও সৃজনশীলভাবে পৌঁছাতে পারছে, সেটি। প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেকদের অভিজ্ঞতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বর্তমান প্রজন্মের নতুন ভাবনা ও প্রশ্নও প্রয়োজন। এ দুইয়ের সমন্বয়েই একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। 'শিকড়' নামটির মধ্যেও যেন এ ধারাবাহিকতার একটি প্রতীক রয়েছে। শিকড় মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখে, কিন্তু গাছকে আকাশের দিকে বেড়ে উঠতেও সাহায্য করে। অতীতের সঙ্গে সংযোগ তাই ভবিষ্যতের পথে বাধা নয়; বরং সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সেটিই ভবিষ্যতের শক্তি। তাই এ মাইলফলক উদ্যাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও সুযোগ তৈরি করে। এতদিনের অর্জনকে সম্মান করার পাশাপাশি সামনে কী করা দরকার, সে প্রশ্নও জরুরি। আরও বেশি শিক্ষার্থীকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, নতুন প্রতিভাকে সামনে আনা, মুক্তচিন্তার পরিসর তৈরি করা এবং সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা—এসব হতে পারে আগামী দিনের পথচলার অংশ। একটি সংগঠনের ইতিহাস তার অতীত দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় না সেখানে। 'শিকড়'-এরও তাই অতীত আছে, উত্তরাধিকার আছে; সামনে রয়েছে আরও দীর্ঘ পথ। সেই পথে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় যেন শুধু একটি পুরোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে না হয়। বরং এমন একটি পরিসর হিসেবে হোক, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের কণ্ঠ খুঁজে পায়, অন্যের কণ্ঠ শুনতে শেখে এবং বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের সময় হিসেবে না দেখে মানুষ হয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অনুভব করে। ত্রিশ বছরের এ পথচলা সেই সম্ভাবনারই স্মারক। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তার আলো মঞ্চের বাইরে মানুষের ভেতরেও কিছুটা থেকে যায়। 'শিকড়' সেই আলো কতটা ধরে রাখতে পেরেছে এবং আগামী দিনে কতটা ছড়িয়ে দিতে পারবে তার উত্তরই লিখবে এর পরবর্তী ইতিহাস।

লেখক : ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন)

সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত