ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চাই পুরো জাতির উন্নয়ন

ওসমান গনি
চাই পুরো জাতির উন্নয়ন

জাতীয় জীবনের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এবং জনমানুষের না বলা কথাগুলোর এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি হলো আপনার এ ভাবনা। একটি স্বাধীন দেশের মূল ভিত্তি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ভৌগোলিক সীমানা কিংবা মানচিত্রের লাল-সবুজ পতাকা নয়, এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে সেই দেশের প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং সামগ্রিক জীবনমানের উন্নয়নের মধ্যে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তার মূলেই ছিল একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সমাজ গঠন, যেখানে বিশ্বমঞ্চে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি সেই মহান আদর্শ থেকে বারবার দূরে সরে গেছে। সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বারবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে শুধু একটি বিশেষ রাজনৈতিক বৃত্ত এবং তাদের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বিত্তবৈভবের পাহাড় গড়ে উঠেছে। রাজনীতি যখন জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আমাদের বিগত দশকগুলোর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে। গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের কথা বলে যিনি বা যারা ক্ষমতায় আসেন, নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার পরেই তাঁদের একটি বড় অংশের রূপ পাল্টে যেতে দেখা যায়। দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ যখন পেটের টানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা নির্বাহ করে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যাদের নাভিশ্বাস ওঠে, তখন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কিছু মানুষ দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েন। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা প্রায়শই দেখতে পাই কীভাবে সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও নীতিনির্ধারকেরা বিদেশে আলিশান জীবনযাপন করছেন, আর দেশের আপামর জনসাধারণকে নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে। এ চরম বৈষম্য ও জনবিচ্ছিন্নতা শুধু অনৈতিকই নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার মূলমন্ত্রের সঙ্গেও সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নীতিনির্ধারকদের মনে এ বোধোদয় ঘটে যে ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং বিশাল দায়িত্ব। রাজনীতি যদি মানবকল্যাণের ব্রত না হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করতে পারে না। দলীয় সংকীর্ণতা, পরিবারতন্ত্র এবং দলীয় কোন্দল এ দেশের রাজনীতিতে এমন এক অসুস্থ সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে দেশ ও দশের কল্যাণের চেয়ে দলের জয়-পরাজয় এবং নেতার তোষণকেই বড় করে দেখা হয়। অথচ রাজনীতি হওয়া উচিত ছিল দল-মত-নির্বিশেষে সব মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের এক সর্বজনীন মঞ্চ। যখন কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দল সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জাতির উন্নয়নের কথা ভাবে, তখন সেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষটির কাছেও পৌঁছায়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনগণের ক্ষোভ কখনোই চিরস্থায়ীভাবে দমন করে রাখা যায় না। সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ধৈর্যশীল; তারা কষ্ট সহ্য করতে জানেন, অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে জানেন, কিন্তু যখন তারা দেখেন যে তাদের ঘামে অর্জিত সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ লুটপাট করে খাচ্ছে এবং তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন সেই ধৈর্য আর থাকে না। পুঞ্জীভূত অভিমান ও ক্ষোভ একসময় তীব্র গণরোষে রূপ নেয়, যা যেকোনো পরাক্রমশালী সরকারকে মুহূর্তের মধ্যে ধসিয়ে দিতে পারে। বিগত দিনে যেসব সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি জনগণের এই নাড়ির স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, ক্ষমতা হারানোর পর ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাদের স্থান হয়েছে। এ নির্মম সত্যটি যত দ্রুত আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুধাবন করতে পারবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজের বৈষম্য দূর করা। কিন্তু যখন নীতিপ্রণেতারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন, তখন গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা ভেঙে পড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সুশাসনের অভাব দেখা দেয়। মেধার মূল্যায়ন না হয়ে দলীয় আনুগত্য যখন যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজ থেকে প্রকৃত প্রজ্ঞাবান ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব হারিয়ে যায়। এর ফলে যুবসমাজ হতাশ হয়ে পড়ে এবং দেশ গঠনে তাদের যে উদ্দীপনা থাকার কথা, তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির জন্য মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন অপরিহার্য।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে তার প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্যে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের যে মূল আদর্শ এবং স্বপ্ন সামনে রেখে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা ছিল একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের এক অসুস্থ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চাকা আশানুরূপভাবে ঘোরেনি; বরং মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগী মানুষের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে সমাজে চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছে। রাজনীতি যখন জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিত্তবৈভব অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা শুধু নৈতিকতার পতনই ঘটায় না, বরং গোটা জাতির অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, জনগণের সহনশীলতার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। সাধারণ মানুষ সবসময়ই শান্তি ও শৃঙ্খলার পক্ষে, কিন্তু যখন তাদের ঘামে অর্জিত সম্পদ ও অধিকারের ওপর আঘাত আসে এবং তাদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়, তখন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক অনিবার্য বিস্ফোরণে রূপ নেয়। অতীতে যারা জনগণের এই মৌলিক স্পন্দন এবং অধিকারকে উপেক্ষা করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিল, ইতিহাসের নির্মম পরিণতি তাদের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়েছে। এ ঐতিহাসিক সত্য থেকে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শিক্ষা নিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় ভোগের বস্তু নয়, এটি লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি পবিত্র আমানত এবং বিশাল ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

অতএব, ব্যক্তিগত ও দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এখন আমাদের সমগ্র জাতির কল্যাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সময় এসেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার সাধন করা এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ব্রত। তরুণ প্রজন্মকে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার মাধ্যমেই শুধু আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করা সম্ভব। আসুন, সব ধরনের দলীয় কোন্দল, লোভ ও সংকীর্ণতা পরিহার করে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আজই আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই।

পরিশেষে বলা যায়, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল বা সংবিধানের পরিভাষায় পরিবর্তন এনে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনে জনকল্যাণ ও সাম্যবাদের নীতি অগ্রাধিকার পায়। বিগত দিনে যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজেদের পারিবারিক ও দলীয় বৃত্তের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, জনগণ তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে, এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তাই আগামীদিনের বাংলাদেশ গঠনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত মেধাবীদের মূল্যায়ন করার বিকল্প নেই। একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণের এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব শুধু সরকার বা রাজনীতিকদের একার নয়; এর জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও সোচ্চার ভূমিকা। আসুন, ক্ষমতার লোভ ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক কোন্দলের বর্ম ভেঙে আমরা এমন এক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং দল বা ব্যক্তির নয়, শুধু সামগ্রিক জাতির সার্বিক উন্নয়নই হবে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির একমাত্র মাপকাঠি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত