ঢাকা রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষকের হাতে শুধু বই নয়, গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

নিয়ামুর রশিদ শিহাব
শিক্ষকের হাতে শুধু বই নয়, গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই জাতি তার নতুন প্রজন্মকে কীভাবে গড়ে তুলছে, তার ওপর। আর নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরদের একজন হলেন শিক্ষক। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, আচরণ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। তাই শিক্ষকের হাতে শুধু বই নয়, থাকে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। দিনটি শিক্ষকদের অবদান, অধিকার, মর্যাদা ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলাদেশেও দিবসটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। তবে শিক্ষক দিবসে শুধু ফুল, শুভেচ্ছা ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের ভাবতে হবে দেশের শিক্ষকরা কেমন আছেন, তারা কী ধরনের পরিবেশে কাজ করছেন এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য তারা কতটা সহায়তা পাচ্ছেন?

শিক্ষকতার দায়িত্ব অন্য অনেক পেশার চেয়ে আলাদা। একজন চিকিৎসক একজন রোগীকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন, একজন প্রকৌশলী একটি স্থাপনা নির্মাণ করেন, আর একজন শিক্ষক গড়ে তোলেন মানুষ। তার কাজের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। একটি ভালো পাঠ, একটি উৎসাহের বাক্য কিংবা একজন শিক্ষকের দেওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে বহু বছর পরও প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অবহেলা, অপমান কিংবা ভুল নির্দেশনার নেতিবাচক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ কারণেই শিক্ষকতার সঙ্গে দায়িত্বের পাশাপাশি গভীর মানবিকতা ও পেশাগত দক্ষতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষক সংকট তার অন্যতম। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদশূন্য থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকলে একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মানের ওপর পড়ে। শিক্ষক সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

একজন শিক্ষককে যদি একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী সামলাতে হয়, পাঠ পরিকল্পনা, মূল্যায়ন, খাতা দেখা ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু সবাইকে একই পাঠ পড়ানো নয়; বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজের চাপ। একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন, পরামর্শ প্রদান ও শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ, তথ্য সংগ্রহ, রিপোর্ট তৈরি, অনুষ্ঠান আয়োজনসহ নানা দায়িত্ব তাদের সময় ও মনোযোগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে শ্রেণিকক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কমে যায়।

শিক্ষককে যদি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তার কাজের পরিবেশও সেই গুরুত্ব অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করলেই হবে না; তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, পর্যাপ্ত জনবল ও সহায়ক কর্মপরিবেশও দিতে হবে। একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা কখনও শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা।

বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের সামনে নতুন একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। শিক্ষার্থীরা এখন মুহূর্তের মধ্যে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বিভিন্ন এআই টুল দিয়ে তারা লেখা তৈরি, তথ্য অনুসন্ধান, অনুবাদ কিংবা জটিল বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। ফলে শিক্ষকতার প্রচলিত ভূমিকা বদলাচ্ছে। আগে শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস; এখন তিনি ক্রমেই হয়ে উঠছেন জ্ঞান যাচাই, বিশ্লেষণ ও সঠিক ব্যবহারের পথপ্রদর্শক।

এআইয়ের বিস্তারের কারণে শিক্ষক অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবেন— এমন ধারণার চেয়ে বরং শিক্ষকের ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী ইন্টারনেট বা এআই থেকে তথ্য পেতে পারে; কিন্তু কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি ভুল, কোন তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো বিষয়ে কীভাবে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে— এসব শেখাতে একজন দক্ষ শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের শিক্ষক তাই শুধু বইয়ের পাঠ দেবেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, যাচাই করতে, যুক্তি দিতে এবং সৃজনশীলভাবে ভাবতে শেখাবেন।

এখানে শিক্ষকদের নিজেদেরও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তা শিক্ষার সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন রিসোর্স, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার ও এআইভিত্তিক বিভিন্ন টুল সম্পর্কে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে শ্রেণিকক্ষ আরও কার্যকর হতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নৈতিকতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শিক্ষকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করা। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সাফল্য হতে পারে; কিন্তু সেটিই শিক্ষার শেষ লক্ষ্য নয়। একজন শিক্ষার্থীকে সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল, যুক্তিবাদী ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।

সমাজে যখন অসহিষ্ণুতা, গুজব, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তখন শিক্ষকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। একটি ছবি, ভিডিও বা পোস্ট দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়— এ বোধও শিক্ষার অংশ। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার উত্তর শেখাবেন না; বরং বাস্তব জীবনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শেখাবেন। এভাবেই শিক্ষা জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে।

তবে শিক্ষককে সব সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। শিক্ষার মান উন্নয়নের দায়িত্ব শিক্ষক, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাষ্ট্র সবার। পরিবারকে সন্তানের পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহযোগিতা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর রাষ্ট্রকে শিক্ষকদের জন্য কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকতার পেশায় মেধাবী ও সৃজনশীল তরুণদের আকৃষ্ট করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। একটি দেশের শিক্ষকতার পেশা যত বেশি মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও পেশাগতভাবে বিকাশের সুযোগসমৃদ্ধ হবে, তত বেশি দক্ষ মানুষ এ পেশায় আসতে উৎসাহিত হবেন। শিক্ষকতার মান উন্নয়ন মানেই শুধু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নয়; বরং শিক্ষকতা পেশাকে দীর্ঘমেয়াদে আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক করে তোলা।

শিক্ষকদের মূল্যায়নেও ভারসাম্য প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একজন শিক্ষকের সাফল্য নির্ধারণ করা হলে শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্য উপেক্ষিত হতে পারে। কোনো শিক্ষক হয়তো এমন একজন শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন, যে আগে শ্রেণিকক্ষে কথা বলত না। কেউ হয়তো ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় ফিরিয়ে এনেছেন। কেউ হয়তো একটি শিশুর মধ্যে বিজ্ঞান, সাহিত্য, খেলাধুলা কিংবা শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছেন। এসব সাফল্যের সবকিছু পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় প্রকল্প দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষক। আজকের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, প্রশাসক কিংবা নীতিনির্ধারক। তাদের চিন্তা ও মূল্যবোধের ভিত গড়ে ওঠে শিক্ষাজীবনেই। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষককে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। শিক্ষকের কাজকে সহজ করা মানে শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ বাড়ানো। একজন দক্ষ ও মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করা মানে একটি শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরির পথে এগিয়ে যাওয়া। শিক্ষকের হাতে থাকা বইয়ের পাতায় হয়তো কয়েকটি অধ্যায়ের পাঠ লেখা থাকে, কিন্তু তার সামনে বসে থাকা প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে জ্ঞান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার আলোয় গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই শিক্ষককে শুধু পাঠদানের মানুষ হিসেবে নয়, জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

'শিক্ষকের হাতে শুধু বই নয়'— থাকে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষকের মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার পাশাপাশি আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত— শিক্ষককে সম্মান করব, তার কাজের পরিবেশ উন্নত করব এবং তার হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার প্রয়োজনীয় শক্তি তুলে দেব।

লেখক : শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত