ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আস্থায় গড়া হোক রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক

জহিরুল ইসলাম
আস্থায় গড়া হোক রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক

রাষ্ট্র আমাদের জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান অথচ অনেক সময় সবচেয়ে অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান। জন্মনিবন্ধন থেকে পাসপোর্ট, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, রাস্তা থেকে আইনশৃঙ্খলা জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িয়ে আছে। নাগরিক যখন কর দেন, আইন মানেন, ভোট দেন কিংবা সরকারি সেবা গ্রহণ করেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্কের মধ্যেই থাকেন। কিন্তু সেই সম্পর্কের প্রকৃতি কী? রাষ্ট্র কি নাগরিকের ওপর কর্তৃত্ব করার প্রতিষ্ঠান, নাকি নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য গড়ে ওঠা একটি জনপ্রতিষ্ঠান? আবার নাগরিক কি শুধু রাষ্ট্রের কাছে অধিকার চাইবেন, নাকি রাষ্ট্রের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নিহিত।

বাংলাদেশের সংবিধান এ সম্পর্কের একটি মৌলিক ধারণা স্পষ্ট করেছে। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ শুধু সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস জনগণ; রাষ্ট্র জনগণের ঊর্ধ্বে কোনো স্বতন্ত্র ক্ষমতার উৎস নয়। সংবিধান নিজেকেও প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এখানেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি পাওয়া যায়— ক্ষমতা এবং বৈধতা এক জিনিস নয়। রাষ্ট্রের হাতে পুলিশ আছে, প্রশাসন আছে, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে; কিন্তু শুধু ক্ষমতা থাকার কারণেই সেই ক্ষমতার প্রতিটি প্রয়োগ ন্যায্য বা বৈধ হয়ে যায় না। ক্ষমতা কীভাবে, কেন এবং কোন সীমার মধ্যে প্রয়োগ হচ্ছে, তার বিচার করতে হয় আইন ও সংবিধানের আলোকে। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র ছাড়া আধুনিক সমাজে নিরাপত্তা, বিচার, অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করা কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা মানেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীন— এমন ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না। বরং রাষ্ট্র যত শক্তিশালী, তার ক্ষমতার ওপর তত বেশি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

কারণ রাষ্ট্রের হাতে এমন কিছু ক্ষমতা থাকে, যা একজন সাধারণ নাগরিকের নেই। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে পারে, কর আরোপ করতে পারে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। এসব ক্ষমতা জনস্বার্থে প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনাও থাকে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্র কী করতে পারে, তার পাশাপাশি রাষ্ট্র কী করতে পারে না।

এ সীমারেখার কেন্দ্রেই রয়েছে নাগরিক অধিকার। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়াকে অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। এসব বিধানের তাৎপর্য শুধু আদালতের ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাধারণ নাগরিক যখন থানায় যান, সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে যান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন কিংবা বিচার চান— তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বাস্তব পরীক্ষা ঘটে। নাগরিকের পরিচয় তখন শুধু ভোটার বা করদাতা নয়; তিনি আইনের সুরক্ষাপ্রাপ্ত একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ।

এখানেই আরেকটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি— সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়। সরকার পরিবর্তিত হয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামো তার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। ফলে সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা নাগরিক অংশগ্রহণেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে; সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার কথাও সেখানে রয়েছে।

তাই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে যদি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে নাগরিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন না, সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন না কিংবা অন্যায় দেখেও নীরব থাকতে বাধ্য হবেন, তাহলে আনুগত্য আর নাগরিক দায়িত্ব থাকে না; তা অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়। প্রকৃত নাগরিকত্বের সঙ্গে প্রশ্ন করার অধিকারও জড়িত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে নাগরিকের কোনো দায়িত্ব নেই। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক একমুখী নয়। নাগরিকের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি আইন মানা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, কর প্রদান, জনসম্পদ রক্ষা, সহিংসতা ও বৈষম্য প্রত্যাখ্যান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মতো দায়িত্বও রয়েছে। নিজের স্বাধীনতা ভোগ করতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতা নষ্ট করার অধিকার কোনো নাগরিকের নেই।

এখানে ভারসাম্যটি গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলে তার অধিকার সংকুচিত করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অধিকার দাবি করে দায়িত্ব অস্বীকার করাও গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের পূর্ণ ধারণা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্বও শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শেষ হয় না। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশকে এমন একটি গণতন্ত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদা ও মূল্য নিশ্চিত হবে; জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ একটি ভালো রাষ্ট্র শুধু অপরাধ দমন করে না; নাগরিককে এমন পরিবেশও দেয়, যেখানে তিনি মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন। একটি সরকারি হাসপাতালের সেবা, একটি বিদ্যালয়ের মান, একটি আদালতে ন্যায়বিচারের সুযোগ, একটি সরকারি দপ্তরে নাগরিকের সঙ্গে আচরণ কিংবা দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের সাড়া— এসবই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের বাস্তব মাপকাঠি।

এ কারণে রাষ্ট্রকে শুধু ক্ষমতার কাঠামো হিসেবে দেখলে বিষয়টির অর্ধেকই দেখা হয়। রাষ্ট্র একই সঙ্গে একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, অধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি নিজের কাজের ব্যাখ্যা দেওয়ার এবং ভুল হলে সংশোধনের সক্ষমতাও রাষ্ট্রের থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এখানেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের আরও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে আসে— নাগরিক কেন রাষ্ট্রকে ভয় না পেয়ে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখবেন? ভয় ও আস্থার পার্থক্যকে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যায় না। রাষ্ট্রচিন্তার দৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের বৈধতা ও নাগরিকত্বের প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

যে নাগরিক মনে করেন, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান তার কথা শুনবে না, অন্যায় হলে তিনি প্রতিকার পাবেন না, ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য আইনের মাপকাঠি এক নয়— তিনি রাষ্ট্রকে হয়তো মেনে চলবেন; কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখবেন না। সেখানে আনুগত্য থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিকত্বের গভীর বোধ থাকে না। কারণ ভয় মানুষকে নীরব করতে পারে, আস্থা তাকে অংশগ্রহণ করতে শেখায়। ভয় মানুষকে আইন মানতে বাধ্য করতে পারে; আস্থা তাকে আইনকে ন্যায্য বলে মেনে নেওয়ার নৈতিক ভিত্তি দেয়। ভয় রাষ্ট্রের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য তৈরি করে; আস্থা রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের একটি অন্তর্গত সম্পর্ক তৈরি করে।

তাই রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল এই দিয়ে মাপা যায় না যে তার আইন কত কঠোর, প্রশাসন কত শক্তিশালী কিংবা মানুষ কতটা নিয়ম মেনে চলছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— মানুষ কেন আইন মানছে? শুধু শাস্তির ভয়ে, নাকি তারা বিশ্বাস করে যে আইন ন্যায্য, সবার জন্য সমান এবং রাষ্ট্রও সেই আইনের অধীন? এখানেই রাষ্ট্রের বৈধতার প্রশ্নটি সামনে আসে। রাষ্ট্রের হাতে বলপ্রয়োগের বৈধ ক্ষমতা থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা শুধু বলপ্রয়োগ থেকে আসে না। নাগরিকের সম্মতি, ন্যায়বিচারের অভিজ্ঞতা, সমান মর্যাদা, নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহি— এসবের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র নাগরিকের আস্থা অর্জন করে।

একজন নাগরিক যদি জানেন, তার সঙ্গে অন্যায় হলে আদালতে যাওয়ার পথ খোলা আছে; সরকারি কর্মকর্তা তাঁর কাছে জবাবদিহি করতে পারেন; আইন তার সামাজিক অবস্থান বা রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বদলে যায় না; তাঁর মতপ্রকাশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না—তাহলে রাষ্ট্র তাঁর কাছে শুধু ক্ষমতার কাঠামো থাকে না, হয়ে ওঠে একটি ন্যায়সংগত সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

এখানে নাগরিকের স্বাধীনতার সঙ্গে রাষ্ট্রের শক্তির কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। বরং একটি পরিণত রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায় তার নিজের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র জানে কোথায় তার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এবং কোথায় তাকে পিছিয়ে থাকতে হবে, যে রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিজের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক জীবনের স্বাভাবিক শর্ত হিসেবে গ্রহণ করে— সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র। কারণ দুর্বল রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায়; শক্তিশালী রাষ্ট্র সমালোচনা সহ্য করতে পারে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান প্রশ্নকে দমন করতে চায়; শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। আর যে রাষ্ট্র নিজের ভুল স্বীকার ও সংশোধনের ক্ষমতা রাখে, তার প্রতি নাগরিকের আস্থা আরও গভীর হয়।

এ কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে শুধু অধিকার বনাম দায়িত্বের হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। এর ভেতরে রয়েছে একটি নৈতিক সম্পর্কও। রাষ্ট্র নাগরিককে শুধু সেবা দেবে— এমন নয়; তাকে একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে স্বীকার করবে। নাগরিকও শুধু সুবিধা নেবেন— এমন নয়; তিনি অন্য নাগরিকের অধিকার, আইন এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই সম্পর্ককে তাই এক ধরনের পারস্পরিক নৈতিক চুক্তি হিসেবেও দেখা যায়। রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সুরক্ষিত করবে; নাগরিক রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করবেন। কিন্তু এ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো— দুই পক্ষই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

রাষ্ট্র যদি নাগরিককে আইন মানতে বলে, রাষ্ট্রকেও আইন মানতে হবে। নাগরিকের কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি করলে রাষ্ট্রকেও জবাবদিহি গ্রহণ করতে হবে। নাগরিকের স্বাধীনতা যদি সীমিত করার প্রয়োজন হয়, সেই সীমাবদ্ধতারও হতে হবে আইনসম্মত, যুক্তিসংগত ও জনস্বার্থভিত্তিক। অন্যথায় আইন নিজেই ক্ষমতার ইচ্ছার হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। গণতন্ত্র এমন কোনো ব্যবস্থা নয় যেখানে রাষ্ট্র কখনো ভুল করবে না। বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র ভুল করলে নাগরিক তা বলতে পারবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো তা পরীক্ষা করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত সংশোধন করতে পারবে। এ দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান নাগরিক সেই নন, যিনি কখনো প্রশ্ন করেন না। বরং সেই নাগরিক, যিনি রাষ্ট্রের আইন মানেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন, জনস্বার্থে অংশ নেন এবং প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রকেও বলেন— এখানে আপনি ভুল করছেন।

আর রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্যও হয়তো এমন নয় যে তার নাগরিকেরা তাকে ভয় পায়। বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজায় দাঁড়িয়ে মনে করতে পারেন— আমি দুর্বল হতে পারি; কিন্তু আইনের কাছে আমি অসহায় নই। সেখানেই রাষ্ট্রের শক্তি ও নাগরিকের স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না; তারা একে অন্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত তাই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো— রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের শক্তি কি নাগরিকের মনে ভয় তৈরি করছে, নাকি এমন আস্থা তৈরি করছে যে নাগরিক জানেন— রাষ্ট্র তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু তার মর্যাদার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না? যে রাষ্ট্র এ সীমাটি বুঝতে পারে, সে শুধু শাসন করে না— সে বৈধতা অর্জন করে। আর যে নাগরিক সেই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারেন এবং তবু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারেন— তিনিই শুধু রাষ্ট্রের অধীন নন; তিনি রাষ্ট্রের অর্থ ও উদ্দেশ্যের অংশীদার। রাষ্ট্রের শেষ শক্তি তাই তার হাতে থাকা ক্ষমতায় নয়; নাগরিকের মনে থাকা আস্থায়। কারণ ভয় থেকে নীরব নাগরিক পাওয়া যায়; কিন্তু আস্থা থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীন নাগরিক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত