প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬
একটি অন্ধকার ব্ল্যাকবোর্ড। তার সামনে দাঁড়িয়ে একজোড়া হাত। সাদা চকের গুঁড়ো আঙুলে মেখে যিনি একের পর এক দাগ টেনে যান, তিনি কেবল বোর্ডে লেখেন না। তিনি আসলে এঁকে চলেন আমাদের জীবনের মানচিত্র। শ্রেণিকক্ষের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কালো বোর্ডটি হয়তো প্রতিদিন অসংখ্য অক্ষর, সংখ্যা আর সূত্রের সাক্ষী হয়। সাদা চকের আঁচড়ে সেখানে তৈরি হয় শব্দ, বাক্য, হিসাব কিংবা কোনো জটিল সমীকরণ। ক্লাস শেষে শিক্ষক বোর্ডটি মুছে চলে যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে আর কিছুই থাকে না- শুধু মুছে যাওয়ার কিছু সাদা দাগ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শিক্ষকের হাতে আঁকা সেই দাগগুলো বোর্ড থেকে মুছে গেলেও শিক্ষার্থীর জীবন থেকে সবসময় মুছে যায় না। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করেন না। তিনি কখনও কখনও একজন শিক্ষার্থীর ভেতরে এমন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেন, যার শেষ পৃষ্ঠা হয়তো বহু বছর পরও লেখা হয় না।
শিক্ষক দিবসে তাই শিক্ষকের কথা বলতে গেলে শুধু 'শিক্ষাদান' শব্দটি যথেষ্ট নয়। কারণ শিক্ষকতা একটি পেশা হলেও একজন প্রকৃত শিক্ষক তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিনি কখনও পথপ্রদর্শক, কখনও সংশোধনকারী, কখনও অনুপ্রেরণাদাতা, আবার কখনও এমন একজন মানুষ— যার একটি বাক্য একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই বিশেষ দিনে সেইসব পথের দিশারীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, যারা আমাদের অচেনা ভবিষ্যৎকে চেনা আলোর পথ দেখিয়েছেন। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি নীরব বিপ্লব। একটি শিশু যখন প্রথম স্কুলে পা রাখে, তার মন থাকে এক টুকরো সাদা কাগজের মতো। সেখানে প্রথম অক্ষরের আলো জ্বেলে দেন শিক্ষক। ক খ গ ঘ কিংবা অ ই ঈ উ— এর সেই আঁকাবাঁকা দাগগুলোই যে একদিন বড় হয়ে মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখাবে বা সমাজের হাল ধরবে, তা শিক্ষকের চেয়ে ভালো আর কে-ই বা বিশ্বাস করতে পারে! ক্লাসরুমের সেই চকের দাগগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যায় জীবনের আসল দর্শন।
একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথম শ্রেণিকক্ষে আসে, তখন তার হাতে থাকে খাতা-কলম। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার ধারণা থাকে খুবই অস্পষ্ট। সে জানে না কোন পথে যাবে, কীভাবে ব্যর্থতাকে সামলাবে, ভুল থেকে কীভাবে শিখবে কিংবা নিজের সামর্থ্যকে কীভাবে কাজে লাগাবে। একজন শিক্ষক সেই অজানা পথের ওপর ধীরে ধীরে কিছু চিহ্ন এঁকে দেন। সেই চিহ্নই হয়ে ওঠে জীবনের মানচিত্র।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা প্রায়ই নম্বর, ফলাফল, জিপিএ আর পরীক্ষার সাফল্যকে শিক্ষার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখি। অথচ একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সব শিক্ষা পরীক্ষার খাতায় লেখা যায় না। সততা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, যুক্তিবোধ, প্রশ্ন করার সাহস এবং ভুল স্বীকার করার মানসিকতা- এসবও শিক্ষার অংশ। শিক্ষক বোর্ডে একটি দাগ কাটেন, ভুল হলে তা ডাস্টার দিয়ে মুছে আবার নতুন করে সঠিকটা লিখে দেন।
এ সাধারণ প্রক্রিয়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা— 'ভুল করা মানুষের স্বভাব, কিন্তু ভুল শুধরে নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করাই জীবন।' আমাদের ব্যর্থতার দিনে যখন চারপাশ অন্ধকার মনে হতো, তখন শিক্ষকের একটুখানি সান্ত্বনা আর পিঠ চাপড়ানি নতুন করে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছে। আবার কোনো শিক্ষক হয়তো ভুল উত্তর দেওয়া শিক্ষার্থীকে সবার সামনে অপমান না করে বলেন, 'ভুল হয়েছে, এবার দেখি কোথায় ভুল হয়েছে।' এ একটি বাক্য শিক্ষার্থীকে শুধু একটি উত্তর ঠিক করতে শেখায় না। শেখায় ভুল মানেই শেষ নয়, ভুল থেকে শেখাও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা আজ যে যেখানেই প্রতিষ্ঠিত হই না কেনো— কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বিজ্ঞানী, আবার কেউ উদ্যোক্তা— আমাদের এ সাফল্যের নকশাটি কিন্তু তৈরি হয়েছিল ওই ক্লাসরুমের চার দেয়ালের ভেতরেই। শিক্ষকের চকের দাগগুলো আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মানচিত্রের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বনাগরিক হতে হয়, কীভাবে মানুষের মতো মানুষ হতে হয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে হয়তো চকের জায়গা নিয়েছে মার্কার পেন কিংবা স্মার্টবোর্ড। কিন্তু শিক্ষকের সেই স্নেহমাখানো কণ্ঠ, শাসনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর ভালোবাসা আর আলোর পথ দেখানোর তাড়না একটুও কমেনি।
শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের প্রশংসা করার দিন নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও ভাবার দিন। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, শিক্ষার পদ্ধতি বদলেছে, শ্রেণিকক্ষের ধরন বদলেছে। আজ শিক্ষার্থীর হাতে এমন প্রযুক্তি আছে, যেখানে কয়েক সেকেন্ডেই পৃথিবীর অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। আর জ্ঞান অর্জন করাও যথেষ্ট নয়— সেই জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার বিবেকও প্রয়োজন। এ জায়গাতেই শিক্ষকের গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে আসে।
শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের মনে রাখা দরকার- একজন শিক্ষকের হাতে শুধু চক থাকে না, থাকে অসংখ্য সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। বোর্ডে আঁকা একটি সরল রেখা হয়তো কয়েক মিনিট পর মুছে যায়। কিন্তু সেই রেখা যদি একজন শিক্ষার্থীকে নিজের জীবনের পথ চিনতে সাহায্য করে, তবে সেটি আর নিছক চকের দাগ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি মানচিত্র। পৃথিবীর সকল শিক্ষকরা ভালো থাকুক, শিক্ষকের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি প্রজন্ম।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ