প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬
আমাদের সমাজের খুব চেনা এক নীরব দৃশ্য ঘরে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে অভিনন্দন বার্তার পেছনেও লুকিয়ে থাকে এক প্রচ্ছন্ন দীর্ঘশ্বাস। যে শিশুটি সবে পৃথিবীতে চোখ মেলল, কোনো অপরাধ ছাড়াই তার কপালে লাগিয়ে দেওয়া হয় অদৃশ্য ট্যাগ 'পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়'। প্রশ্ন জাগে কন্যাসন্তানের প্রতি আমাদের সামাজিক মানসিকতার কতটুকু উন্নতি ঘটেছে? সত্যটি হলো, বহু পরিবারে আজও কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার খবরটি আনন্দের বদলে প্রচ্ছন্ন এক নিরাশার বার্তা নিয়ে আসে।
বাস্তব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সামাজিক অবহেলা ও অনীহাই কন্যা শিশুদের বড় সম্ভাবনার পথ আটকে দেয়। তার মতামতকে পরিবারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; তাকে শেখানো হয় মানিয়ে নেওয়ার কিংবা চুপ করে থাকার সংস্কৃতি। এমনকি শৈশবের খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রেও তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় হাজারো সামাজিক বিধিনিষেধ।
জীবনের পদে পদে তাকে অনুধাবন করানো হয় যে, সে যেন পরিবারের এক সাময়িক বাসিন্দা এবং অনিবার্য এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক 'দায়'।
বিভিন্ন জাতীয় সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে প্রাথমিক স্তরে ছেলে-মেয়ের ভর্তির হার প্রায় সমান হলেও মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষার স্তরে গিয়ে বিপুল সংখ্যক কন্যা শিশু ঝরে পড়ে। এই ঝরে পড়ার কারণ শুধু অর্থ সংকট নয়, বরং 'মেয়েদের পেছনে পড়েলেখার খরচ করে লাভ কী' সমাজ গভীরে গেড়ে বসা এ ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। তাছাড়া বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার স্পেসে কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়াও তাদের মুক্ত চলাচলে নতুন সামাজিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ কন্যা শিশুকে অবহেলা না করে তাকে যদি সুযোগ ও সঠিক মূল্যায়ন দেওয়া যায়, তবে সে পরিবার ও সমাজের চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। ইতিহাস ও বর্তমান বারবার প্রমাণ করেছে মেয়েরা সুযোগ পেলে কোনো অংশেই পিছিয়ে থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়াঙ্গন, শিক্ষা, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির জগতে আজকের নারীদের প্রতিটি সাফল্য শুধু তাদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, তা কন্যা শিশুর অসীম সম্ভাবনারই সাক্ষ্য বহন করে।
জন্ম থেকেই তাকে বড় করার প্রতিটি ধাপে সমাজের অবহেলা কন্যা শিশু কেন বোঝা নয় ,তা প্রমাণ করার দায় বহু আগেই তারা চুকিয়ে দিয়েছে। তবে এই সাফল্য গুটি কয়েক সুযোগপ্রাপ্ত নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র প্রতিটি কন্যা শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার অধিকার প্রদান, সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সর্বোপরি পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের দিতে হবে।
আজকের বিশ্ব জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। একটি কন্যা শিশুকে যদি উপযুক্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল দক্ষতায় সমৃদ্ধ করা যায়, তবে সে আর পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। বরং সে নিজে আত্মনির্ভরশীল হয়ে পুরো পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত শক্ত করে তোলে। একজন শিক্ষিত ও দক্ষ কন্যা সন্তান পরিবারের জন্য কোনো বোঝা নয়, বরং দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমাদের মূল বার্তা হওয়া উচিত প্রতিটি কন্যা শিশুকে ঘরে ও বাইরে প্রাপ্য সম্মান ও মূল্যায়ন দেওয়া। তাকে অবহেলার পাত্রী না বানিয়ে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পুরো সমাজের। কন্যা শিশুর ভেতরের সম্ভাবনাকে স্বীকার করা ও তাকে ভালোবাসায় আগলে রাখাই একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজের আসল পরিচয়। ভুল ধারণার অবসান ঘটুক, কন্যা শিশু কোনো বোঝা নয় আমাদের আগামী দিনের সেরা সম্পদ।
লেখক : আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়