প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানব জীবনের বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আগে যা মানুষের কাছে ছিল নিছক কল্পনা তা আজ বিজ্ঞানের বাস্তব গবেষণার বিষয়। আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি তারই এক বিস্ময়কর উদাহরণ। একসময় আকাশে মেঘ জমেছে, অথচ এক ফোটাও বৃষ্টির পানি পড়ছে না এমন দৃশ্য শুষ্ক অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রকৃতির এই কার্পণ্যতার বিরুদ্ধে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান এক ভিন্ন পথ খুঁজে বের করেছে যার নাম ক্লাউড সিডিং বা কৃত্রিম বৃষ্টি। এটি মূলত আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে কৃত্রিম উপায়ে মেঘ ঘনীভূত করে বৃষ্টি বা তুষারপাত ঘটানো হয়।
প্রাকৃতিক উপায়ে বৃষ্টি হওয়ার জন্য বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও মেঘের গঠন দরকার। কিন্তু ক্লাউড সিডিং এর মূল ধারণা হলো উপযুক্ত মেঘের মধ্যে নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র কণিকা যুক্ত করা যা মেঘের ভেতরের ক্ষুদ্র পদার্থিক প্রক্রিয়াকে বদলে দেয়। ফলে মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা ও ধরন বদলায়। সাধারণত এরোপ্লেন, ড্রোন বা রকেটের সাহায্যে আকাশে থাকা উপযুক্ত মেঘের উপর সিলভার আয়োডাইট, শুষ্ক বরফ কিংবা সোডিয়াম ক্লোরাইড বা সাধারন লবণ ছিটানো হয়। এর ফলে মেঘের সূক্ষ্ম জলীয় কণাগুলো জমাট বাঁধতে শুরু করে এবং বড় বড় পানির ফোঁটায় পরিণত হয়। পরে ফোঁটা গুলো ভারি হয়ে মধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীতে বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে ঝরে পড়ে।
তবে মনে রাখা জরুরী যে কৃত্রিম বৃষ্টি বিজ্ঞানের কোনো জাদুকরী বিষয় নয় অর্থাৎ শূন্য থেকে মেঘ তৈরি নয় বরং উপযুক্ত মেঘ ও প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটানো সম্ভব। এটি মূলত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সীমানার মধ্যেই একটি সীমিত হস্তক্ষেপ। ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের কারণে ভূগর্ভস্থ পানি, নদী ও জলাধারগুলো এখন অপর্যাপ্ত ও হুমকির মুখে। তাই বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা জলবায়ুগত পরিবর্তন মোকাবেলায় ক্লাউড সিডিং এর মাধ্যমে পানির যোগান বাড়ানোর সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখছেন। তীব্র পানির সংকট থাকা অঞ্চলগুলোতে কৃত্রিম বৃষ্টি ফসলের সেচে পানির অভাব নিবারণ, বায়ু দূষণ রোধ, কুয়াশা দূর ও দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, বিশ্বের ৫২ টি বা তার বেশি দেশে ক্লাউড সিডিং প্রোগ্রাম রয়েছে যা ৩৪ টি বেসরকারি আবহাওয়া পরিবর্তনকারী সংস্থা দ্বারা পরিচালিত। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষকরা প্রথম এই পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেন। আমেরিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলো যেমন- ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, নেভাদা, ইউটাহ, কলোরাডোসহ অন্তত দশটি রাজ্যে কয়েক দশক ধরে ক্লাউড সিডিং করা হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম ক্লাউড সিডিং প্রোগ্রামটি হচ্ছে চীনের। ২০০৮ সালের অলিম্পিক গেমসের আগে আকাশকে বৃষ্টিমুক্ত ও ধূলিমুক্ত রাখতে তারা সফল ক্লাউড সিডিং অভিযান পরিচালনা করে।
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর পরিকল্পনা করা হয়। তবে বাতাসে অপর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা না থাকার কারণে প্রযুক্তিটি সফল হয়নি। এমনকি ১৯৮০ এর দশক থেকে খারার প্রভাব মোকাবেলায় ভারতের কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে ক্লাউড সিডিং করা হয়েছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, রাশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো কৃষি সমস্যা সমাধান, পানি সংকট মোকাবেলা, মেঘ ও ধোঁয়াশা নিয়ন্ত্রণ ও দূষণ রোধ ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন সময়ে ক্লাউড সিডিং করেছে। এত কিছুর পরেও কৃত্রিম বৃষ্টির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে কিছুটা অনিশ্চিত এবং এখনও বিতর্কিত। সাধারণত আকাশে উপযুক্ত মেঘ ও পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প না থাকলে এ প্রযুক্তি কাজ করে না।
অর্থাৎ এর মাধ্যমে বিদ্যমান মেঘ থেকেই বৃষ্টি নামানোর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলা হয়। কিন্তু এ প্রযুক্তির ফলে বৃষ্টির পরিমাণ কতটুকু বাড়লো বা বৃষ্টি প্রাকৃতিক কারণে হয়েছে কিনা তা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা কঠিন। কৃত্রিম বৃষ্টির প্রধান সমস্যা শুধু অনিশ্চয়তাই নয় বরং এক অঞ্চলে ক্লাউড সিডিংয়ের কারণে বৃষ্টিপাত হলে পাশের অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হবার সম্ভাবনা কমে যায়। এতে করে ওই অঞ্চলে খরার প্রকোপ বাড়তে পারে। এমনকি প্রতিবেশী দেশে ক্লাউড সেডিং এর কারণে বৃষ্টির পরিমাণ কমছে কিনা তা প্রমাণ করাও প্রায় অসম্ভব। ফলে দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে।
তাছাড়া সিডিং এর সময় ব্যবহৃত সিলভার আয়োডাইট মাটি ও পানিতে জমে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। যদিও এক্ষেত্রে গবেষণা অপর্যাপ্ত। শুধু তাই নয় কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর জন্য যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় সে পরিমাণ অর্থ জলাধার সংরক্ষণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো দেশ চাইলেই আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের এই প্রযুক্তিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। যেমন, ১৯৬৭-১৯৭২ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ক্লাউড সিডিং এর মাধ্যমে বর্ষাকে দীর্ঘায়িত করে শত্রুর সরবরাহের পথ কাদাময় করার চেষ্টা করে। যদিও পরবর্তীতে এ ঘটনার জের ধরেই জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো ১৯৭৬ সালে ENMOD চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
আবার বাংলাদেশের মতো ক্রান্তীয় অঞ্চলে পরিবেশগত ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃত্রিম বৃষ্টির কিছু সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেহেতু বর্ষাকালে বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টি হয় ফলে তখন কৃত্রিম বৃষ্টির নামানোর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ঢাকার বায়ু দূষণ কমাতে কৃত্রিম বৃষ্টির সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা হয়েছে। যাই হোক ক্লাউড সিডিং বিজ্ঞানের এক চমকপ্রদ বিস্ময় হলেও এটি বৃষ্টি নামানোর কোনো জাদুকাঠি নয় বরং প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য মানুষের একটি ছোট চেষ্টা। মানুষের এই পদক্ষেপ বিজ্ঞান ও প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে এক নতুন সামঞ্জস্য।
লেখক : শিক্ষার্থী