ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইরাসমাসের দিনগুলো

নাজমুল হাসান
ইরাসমাসের দিনগুলো

বিদেশ ভ্রমণ মানেই শুধু নতুন একটি দেশ দেখা নয়; কখনও কখনও এটি হয়ে ওঠে নিজেকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ। ইরাসমাস প্লাস প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তুরস্কে যাওয়া আমার জন্য ছিল তেমনই এক অভিজ্ঞতা। কয়েক দিনের এ সফরে একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনা, আত্ম-উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পেয়েছি। প্রশিক্ষণের বাইরে প্রতিটি দিনও যেন নিয়ে এসেছে নতুন কোনো গল্প, কখনও আন্তর্জাতিক পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়, কখনও আধুনিক গবেষণাগার পরিদর্শন, আবার কখনও ঐতিহাসিক স্থাপনা, মসজিদ, পাহাড় কিংবা বসফরাসের নীল জলরেখা। তাই তুরস্কের দিনগুলো আমার কাছে শুধু একটি বিদেশ সফর নয়; এটি হয়ে উঠেছে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও আত্ম-উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ একটি স্মরণীয় শিক্ষাযাত্রা।

বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘযাত্রা শেষে ইস্তানবুলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হোটেলে উঠি। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ সবকিছুই ছিল অপরিচিত, তবে কৌতূহলে ভরা। বিকেলে ইস্তানবুলে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হলো। আগে থেকেই যোগাযোগ থাকায় প্রথম দেখাতেও তারা অপরিচিত মনে হননি। পরদিন শুরু হয় সফরের মূল উদ্দেশ্য, ইস্তানবুল গেলিশিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরাসমাস প্লাসপ্রশিক্ষণ। পরিচিতিমূলক সভায় পুরো কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাই। আন্তর্জাতিক ও ইরাসমাস অফিসের পাশাপাশি নিজের আগ্রহে অ্যাডমিশন অফিস ও স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স অফিসও ঘুরে দেখি। বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথি ও প্রতিনিধিদলের নিয়মিত আগমন আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। মিশর, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও অতিথিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। তখন উপলব্ধি করি, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমষ্টি নয়; এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতারও একটি সক্রিয় কেন্দ্র।

হোটেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খুব বেশি দূরে ছিল না। হেঁটে যেতে সময় লাগত ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো। পথটি কিছুটা উঁচু-নিচু হওয়ায় ফেরার সময় হাঁটতে একটু বেশি কষ্ট হতো। তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও ইস্তানবুলের বাতাসে ছিল স্বস্তির পরশ।

পরের দিন আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক ড. আলিসা এবং ইরাসমাস প্লাস বিশেষজ্ঞ ইয়ারেনের সঙ্গে বৈঠক ছিল সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তাদের উপস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থান, গবেষণা, শিক্ষার্থী, পেটেন্ট, গবেষণা কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। প্রায় ৯৩০টি পেটেন্ট, ২২টি গবেষণা কেন্দ্র, ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং ১২ হাজারের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীর তথ্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি শুধু শিক্ষার্থী সংখ্যা বা একাডেমিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না। ইরাসমাস কর্মসূচি পরিচালনায় প্রশাসনিক সমন্বয়, কার্যকর যোগাযোগ ও সুপরিকল্পনার গুরুত্বও আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। সেদিন গেলিশিম টাওয়ারে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষক রাহমতুল্লাহর সঙ্গে দেখা হয়। তার গবেষণা ও তুরস্কে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কাছ থেকে শোনা ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। একজন বাংলাদেশি কীভাবে আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করছেন, তা নিজের চোখে দেখা আমার জন্য ছিল বিশেষ প্রাপ্তি।

পরের দিন মালয়েশিয়ার মাল্টিমিডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। বৈঠকে তাদের গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই। এ বৈঠক থেকে উপলব্ধি করি, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা একাডেমিক অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, উদ্যোক্তা মানসিকতা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধও একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

এ দিন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সেশন ছিল সময় ব্যবস্থাপনা ও কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর। এ সেশন থেকে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি, উৎপাদনশীলতা মানে বেশি সময় কাজ করা নয়; বরং সঠিক কাজকে সঠিক সময়ে এবং সঠিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সম্পন্ন করা।

পরদিন সেক্রেটারি জেনারেল বিভাগের ব্যক্তিগত সহকারী তুঘচে চেলিকের সঙ্গে মতবিনিময়েম মাধ্যমেপ্রশাসনিক কার্যক্রম বোঝাবিশেষভাবে সহায়ক ছিল। তার কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশাসনিক বিষয়গুলোর নিয়মিত তদারকি এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারি। অনলাইনভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা কীভাবে দ্রুত যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান ও কাজের সমন্বয় সহজ করে, সেটিও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়।

এরপর অংশগ্রহণ করি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নির্ধারণ ও আত্ম-উন্নয়ন বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশনে। আমার কাছে এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ এখানে অন্য কাউকে নয়, বরং নিজেকেই মূল্যায়ন করার পদ্ধতি শেখানো হয়েছে। নিজের বর্তমান জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার তুলনা করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সহজভাবে বললে, আমি কী শিখব, কেন শিখব, কী ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, কখন শিখব এবং অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে প্রয়োগ করব, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই নিজের উন্নয়নের পথ তৈরি করতে হবে। পরের দিন ছিল ইরাসমাস প্লাস সফরের অন্যতম আকর্ষণীয় দিন। এদিন ইস্তানবুল গেলিশিম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভরপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগার পরিদর্শনের সুযোগ হয়। টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রযুক্তি উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, রোবোটিকস এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কীভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তা এখানে আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

বিকেলে সিটি ট্যুরের জন্য চলে আসি ফাতিহ এলাকায়। এরপরের দুই দিন ছিল মূলত ইস্তানবুল ও আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার দিন। তুরস্কে দলগত ভ্রমণের ব্যবস্থা আমার কাছে বেশ সুবিধাজনক মনে হয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্রমণ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে হোটেল থেকে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা, দুপুরের খাবার এবং নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের সুযোগ থাকে। ইস্তানবুলের গণপরিবহন ব্যবহারে 'ইস্তানবুলকার্ট'ও ছিল বেশ কার্যকর।

ভ্রমণের প্রথম দিন ছিল ইস্তানবুলের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার দিন। ব্লু-মসজিদ, হিপোড্রোম, হায়া সোফিয়া ও গ্র্যান্ড বাজার ঘুরে এরপর যাই তোপকাপি প্রাসাদে। তোপকাপি প্রাসাদ ছিল আমার সফরের অন্যতম আবেগঘন অভিজ্ঞতা। সেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র নিদর্শন বা পবিত্র আমানত দেখার সুযোগ আমার জন্য অত্যন্ত বিশেষ একটি মুহূর্ত ছিল।

ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন ছিল বুরসা ভ্রমণ। ইস্তানবুল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রায় বুরসা পৌঁছাই। পথজুড়ে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দৃশ্য এবং পাহাড়ি এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ হয়। বুরসায় সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল শুধু কারে করে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নামা। উচ্চতা থেকে নিচের দিকে তাকালে কিছুটা ভয় লাগলেও চারপাশের প্রকৃতি ছিল দারুণ মনোমুগ্ধকর। পাহাড়ের উচ্চতায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া আরও ঠান্ডা হয়ে আসে। স্থানীয় খাবার, ফলমূল, পাহাড়ি পরিবেশ এবং ফেরিতে করে ফিরে আসা; সব মিলিয়ে দিনটি দীর্ঘ হলেও ছিল আনন্দময়। পরের দিন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। এ দিন ছিল ক্যাম্পাস পরিদর্শন এবং ইরাসমাস প্লাস প্রশিক্ষণ সনদ প্রদান অনুষ্ঠান। পরের দিন ছিল ইস্তানবুলকে ইউরোপ ও এশিয়ার দুই দিক থেকে দেখার দিন। দোলমাবাহচে প্রাসাদ, বসফরাস সেতু, চামলিজা মসজিদ, গোল্ডেন হর্ন, আবু আইয়ুব আল-আনসারি মসজিদ, পিয়ের লোতি পাহাড় এবং বসফরাসে নৌভ্রমণ, সব মিলিয়ে দিনটি ছিল ভিন্নধর্মী। ইস্তানবুলের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, একটি শহরের মধ্যেই ইউরোপ ও এশিয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। একই শহরের দুই মহাদেশীয় পরিচয় যেন শহরটির প্রতিটি দৃশ্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

বিশেষ করে বসফরাসে নৌভ্রমণ শহরটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ দিয়েছে। ইস্তানবুলের শেষ দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা। তবু শেষ মুহূর্তের কিছু কেনাকাটা সেরে দুপুরের খাবার শেষে রওনা হই বিমানবন্দরের পথে।

লেখক : রোভার স্কাউট লিডার, ড্যাফোডিল

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এয়ার

রোভার স্কাউট গ্রুপ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত