ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পিসিওএস : অবহেলা নাকি অজ্ঞতা

শাম্মী শফিক জুঁই
পিসিওএস : অবহেলা নাকি অজ্ঞতা

পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম হলো- নারীদের একটি সাধারণ হরমোনজনিত ও বিপাকীয় ব্যাধি, যা প্রজননক্ষম বয়সে ডিম্বাশয়ের কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। একে বর্তমানে পিওএমএস বা পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমও বলা হয়। এটি মেয়েদের প্রজনন বয়সের একটি সাধারণ হরমোনজনিত ব্যাধি। এ সমস্যায় শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম ১৯৩৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ড্রোম বা রোগলক্ষণ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর আবিষ্কারের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস এমন কিছু নারীর বর্ণনা দিয়েছিলেন যাদের মাসিক বন্ধ ছিল এবং ত্বক ছিল তৈলাক্ত ও পুরু।

প্রথম একজন বিবাহিত বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত নারীর ডিম্বাশয় পর্যবেক্ষণ করে সেটিকে উজ্জ্বল ও পায়রার ডিমের মতো সাদা বলে বর্ণনা করেন। ১৮৪৪ সালে ফরাসি চিকিৎসক আশিল শেরো প্রথম ডিম্বাশয়ের এ সিস্ট বা থলি সদৃশ পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করেন। ১৯৩৫ সালে আমেরিকান স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আরভিং এফ. স্টেইন এবং ড. মাইকেল এল. লেভেনথাল প্রথম প্রমাণ করেন যে নারীদের এ ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক সমস্যাগুলো আসলে একটি নির্দিষ্ট রোগ বা সিন্ড্রোমের অংশ। তারা সাতজন নারীর একটি দলের ওপর গবেষণা চালান, যাদের প্রধান তিনটি সমস্যা ছিল, অনিয়মিত বা বন্ধ মাসিক, শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো এবং ডিম্বাশয় আকারে বড় হয়ে যাওয়া। তারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেখেন যে এই নারীদের ডিম্বাশয়ের চারপাশে ছোট ছোট অসংখ্য তরলপূর্ণ থলি বা ফলিকল জমে আছে। এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর চিকিৎসকদের নামানুসারে দীর্ঘ সময় ধরে রোগটিকে স্টেইন-লেভেনথাল সিন্ড্রোম বলা হতো। পরবর্তীতে ডিম্বাশয়ের গঠনগত রূপ দেখে এর নাম দেওয়া হয় পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা পিসিওএস। পিসিওএস এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রায় ৭০% বা তারও বেশির এই সমস্যাটি থাকে। আমাদের শরীর খাবার থেকে শক্তি তৈরির জন্য ইনসুলিন হরমোন ব্যবহার করে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে শরীরের কোষগুলো এই হরমোনকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এর ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এ অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করে, যার ফলে ডিম্বাশয় থেকে পুরুষ হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেন অতিরিক্ত মাত্রায় তৈরি হতে শুরু করে। অ্যান্ড্রোজেন সাধারণত পুরুষ হরমোন তবে এটি নারীদের শরীরেও সামান্য পরিমাণে থাকে। পিসিওএস হলে ডিম্বাশয় থেকে অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন নিঃসৃত হয়, যা ডিম্বস্ফুটন বা ডিম্বাণু বড় হতে বাধা দেয়। এর ফলে মুখে-শরীরে অতিরিক্ত লোম গজায় এবং ব্রণ হয়। পুরুষ হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেন বেড়ে যাওয়ার কারণে ত্বকে এবং চুলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। মুখমণ্ডল বিশেষ করে থুতনি ও ঠোঁটের ওপরে বুক, পেট, পিঠ কিংবা উরুতে পুরুষদের মতো ঘন, কালো ও মোটা লোম গজাতে শুরু করে। অতিরিক্ত হরমোনের কারণে সেবাম বা তেল নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে তীব্র ব্রণ বা ফুসকুড়ি হয়, যা সহজে কমতে চায় না। মাথার সামনের ও মাঝখানের অংশের চুল পাতলা হয়ে যায় এবং পুরুষদের স্টাইলে চুল পড়তে শুরু করে। পেটের অংশে চর্বি জমে এবং ডায়েট বা ব্যায়াম করার পরেও ওজন কমানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। পিসিওএস আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে মুড সুইং বা মেজাজের ঘন ঘন পরিবর্তন অত্যন্ত তীব্র এবং অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে। হরমোনের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে তাদের মস্তিষ্কের কেমিক্যালগুলোতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই মনের ভাব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই হয়তো খুব হাসিখুশি বা স্বাভাবিক আছেন, তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই তীব্র রাগ, বিরক্তি বা কান্না ভাব চলে আসতে পারে। আশেপাশের মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কেন এমন আচরণ হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে বা সাধারণ বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ একটা অজানা ভয় বা দুশ্চিন্তা কাজ করে। বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা বা প্যানিক অ্যাটাকের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে নিজের শারীরিক পরিবর্তন অর্থাৎ ওজন বৃদ্ধি, মুখে লোম বা ব্রণ নিয়ে তীব্র হীনমন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে পিসিওএস-এর প্রাদুর্ভাব প্রায় ৮% থেকে ১৩%। সাধারণ হিসাবে এটি প্রতি ১০ জনে ১ জন এবং কিছু অঞ্চলের সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রতি ৮ জনে ১ জন। পিসিওএস শুধু একটি শারীরিক বা হরমোনজনিত সমস্যা নয়, বরং এটি একজন নারীর মানসিক ও সামাজিক জীবনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। যেহেতু প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী এই রোগে ভুগছেন, তাই তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এই রোগে দ্রুত ওজন বাড়ে, মুখে ব্রণ ও লোম গজায়। পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে তার চেহারা বা ওজন নিয়ে খোটা না দেওয়া, বরং তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে ডায়েট সবচেয়ে জরুরি। শুধু আক্রান্ত নারীর জন্য আলাদা খাবার না বানিয়ে, পুরো পরিবারের উচিত একসাথে পুষ্টিকর ও কম কার্বোহাইড্রেটের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা। অনেক সময় অনিয়মিত মাসিক বা বন্ধ্যত্বকে আমাদের সমাজে নানা রকম কুসংস্কারের সাথে জড়ানো হয়। সমাজকে বুঝতে হবে এটি সম্পূর্ণ একটি চিকিৎসাগত জটিলতা, কোনো সামাজিক অপরাধ বা অভিশাপ নয়। সরকারি উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যমে পিসিওএস ও নারীদের হরমোনজনিত স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা উচিত, যাতে কিশোরীরা শুরুতেই লক্ষণগুলো চিনতে পারে। স্কুল-কলেজের টিফিনে জাঙ্ক ফুড বা ফাস্টফুড নিষিদ্ধ করা এবং ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক দৈনিক খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়ামের অবকাঠামো তৈরি করা রাষ্ট্রের একটি বড় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হতে পারে। সর্বোপরি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই রোগের প্রকোপ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

লেখক পরিচিতি

নাম :শাম্মী শফিক জুঁই

শিক্ষার্থী : ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

বিভাগ: ইংরেজি

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত