প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
বিশ্ব শিক্ষক দিবস এলেই আমরা শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, শুভেচ্ছা জানাই, তাদের অবদানের কথা স্মরণ করি। কিন্তু শিক্ষকতার প্রকৃত মূল্যায়ন কি শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সম্ভব? একটি ফুল, একটি শুভেচ্ছাবার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট কি একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারে? নিশ্চয়ই পারে না। কারণ একজন শিক্ষক শুধু একটি বিষয় পড়ান না; তিনি মানুষের চিন্তার ভিত তৈরি করেন, মূল্যবোধ গড়ে তোলেন এবং ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য নাগরিক তৈরি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে মানব সম্পদ, ব্যবসা ও অর্থনীতি পড়ানোর গত আঠারো বছরের অভিজ্ঞতায় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি শিক্ষার্থী, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এ দীর্ঘ সময় আমাকে একটি বিষয় আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে শিক্ষকতা আসলে একটি প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের সেতুবন্ধন। একজন শিক্ষক আজ যে শিক্ষার্থীকে পড়ান, সেই শিক্ষার্থীই আগামী দিনে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রশাসন, গবেষণা ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে।
সুতরাং শিক্ষককে বোঝা মানে কেবল একটি পেশাকে বোঝা নয়; শিক্ষককে বোঝা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়াকে বোঝা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কী নিয়ে বের হচ্ছে? উত্তরটি যদি শুধু একটি সার্টিফিকেট হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় একজন তরুণকে শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশের যোগ্য করে তুলবে এটি তার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে তাকে চিন্তা করতে শেখাতে হবে, প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখাতে হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে ব্যবসা ও অর্থনীতির শিক্ষায় এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অর্থনীতির শিক্ষার্থী যদি শুধু মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, প্রবৃদ্ধি কিংবা চাহিদা-জোগানের সংজ্ঞা মুখস্থ করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে এসবের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একইভাবে ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীকে শুধু মার্কেটিং, ফাইন্যান্স বা ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব জানলেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে একজন উদ্যোক্তা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে টিকে থাকে, একজন ভোক্তার আচরণ কেন পরিবর্তিত হয় এবং একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সামাজিক প্রভাব কী হতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করার সক্ষমতা তৈরি করা।
প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থাকে অভাবনীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে। একসময় একটি বিষয়ে তথ্য পেতে আমাদেরকে লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের তথ্য পাওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীদের লেখালেখি, গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ ও শেখার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতে শিক্ষকের ভূমিকা কমেনি; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কারণ তথ্য পাওয়া এবং সঠিক জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। ইন্টারনেটে বিপুল তথ্য আছে, কিন্তু সব তথ্য সঠিক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সেই উত্তর কতটা নির্ভরযোগ্য, তার বিচার করার ক্ষমতা শিক্ষার্থীর থাকতে হবে। এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা। ভবিষ্যতের শিক্ষক হয়তো শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শুধু বক্তৃতা দেবেন না। তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার পথপ্রদর্শক হবেন। তিনি প্রশ্ন করবেন, বিতর্ক তৈরি করবেন, বাস্তব সমস্যা সামনে আনবেন এবং শিক্ষার্থীকে নিজে সমাধান খুঁজে নিতে উৎসাহিত করবেন।
প্রযুক্তি তথ্যের গতি বাড়াতে পারে; কিন্তু মানুষের বিবেক, বিচারবোধ ও মূল্যবোধ তৈরি করার দায়িত্ব এখনো শিক্ষকের। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া তরুণরা কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত? ব্যবসা ও অর্থনীতি পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় প্রায়ই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো একাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে পার্থক্য।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেন; কিন্তু চাকরির সাক্ষাৎকারে নিজের চিন্তা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে না পারলে কিংবা একটি বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যা বিশ্লেষণ করতে না পারলে তার একাডেমিক সাফল্য যথেষ্ট নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে বাস্তব অর্থনীতি ও কর্মবাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, কেস স্টাডি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ এবং বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধানে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা সংস্কৃতি তৈরি করা দরকার।
সব শিক্ষার্থী চাকরি করবে এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। কেউ চাকরি করবে, কেউ ব্যবসা করবে, কেউ গবেষণা করবে, কেউ নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তাদের এই বিভিন্ন পথের জন্য প্রস্তুত করবে। আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল চাই। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষার্থীর ফলাফল দিয়ে একজন শিক্ষকের পুরো অবদান বিচার করা ঠিক নয়। একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং মানসিক প্রস্তুতিসহ অনেক বিষয় কাজ করে। শিক্ষক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; কিন্তু একমাত্র ভূমিকা নয়। তাই শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশা যেমন থাকবে, তেমনি তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ থাকতে হবে। আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষক নিজে যদি শেখার সুযোগ না পান, তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের আজীবন শেখার অনুপ্রেরণা কীভাবে দেবেন? শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ শুধু সামাজিকভাবে সম্মান দেখানো নয়; তার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও এর অংশ। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে, তার মধ্যে নেই। একজন ভালো শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যেও সম্ভাবনা খুঁজে বের করেন। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একই ধরনের শিক্ষার্থী থাকে না। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে শেখে।
কেউ আত্মবিশ্বাসী, কেউ নিজের কথা বলতে ভয় পায়। কেউ পরিবার থেকে শিক্ষার ভালো পরিবেশ পায়, কেউ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। একজন দক্ষ শিক্ষক এই পার্থক্যগুলো বুঝতে পারেন। শিক্ষক যদি শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন, তাহলে তার কাজের একটি বড় অংশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃত শিক্ষক সেই শিক্ষার্থীকেও সামনে এগিয়ে দেন, যে নিজেকে নিয়ে অনিশ্চিত। অনেক সময় একটি উৎসাহের বাক্য, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা একজন শিক্ষকের বিশ্বাস একজন তরুণের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান ও দক্ষতার গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি নৈতিকতার গুরুত্বও বেড়েছে। একজন দক্ষ ব্যবসায়ী যদি নৈতিক না হন, তাহলে তার দক্ষতা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একজন অর্থনীতিবিদ যদি তথ্যের অপব্যবহার করেন, একজন প্রযুক্তিবিদ যদি নিজের জ্ঞান ভুল কাজে ব্যবহার করেন কিংবা একজন প্রশাসক যদি নৈতিকতা হারান, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তাই শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের শুধু কীভাবে সফল হতে হবে তা শেখালে হবে না; তাদের শেখাতে হবে সাফল্যের অর্থ কী, সেই সাফল্য কীভাবে অর্জন করতে হবে এবং সেই সাফল্য সমাজের জন্য কীভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষক এখানেই একটি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজের
আচরণ, সততা ও পেশাগত দায়িত্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করেন। আগামী দিনের শিক্ষককে একই সঙ্গে বিষয়বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবান্ধব, গবেষণামুখী এবং মানবিক হতে হবে। তাকে শুধু নিজের বিষয়ের জ্ঞান রাখলেই চলবে না; সমাজ ও অর্থনীতির পরিবর্তন সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কারণ গবেষণাবিহীন উচ্চশিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে প্রাণহীন হয়ে পড়ে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি না হলে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পুরোনো জ্ঞান বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে আরও বেশি যুক্ত করতে হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমরা শিক্ষকদের সম্মান করি। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও আত্মসমালোচনা করা দরকার। আমরা কি শিক্ষকদের যথেষ্ট সম্মান দিচ্ছি? আমরা কি তাদের গবেষণার সুযোগ দিচ্ছি? আমরা কি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি জীবন ও কর্মজগতের জন্যও প্রস্তুত করছি? আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিল্প, গবেষণা ও সমাজের সঙ্গে যথেষ্ট যুক্ত করতে পেরেছি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ শিক্ষক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য ফুল বা শুভেচ্ছার মধ্যে নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকারে, যেখানে শিক্ষক মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন এবং শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হবে।
একজন শিক্ষক হয়তো রাষ্ট্রের বাজেট তৈরি করেন না, শিল্পকারখানা নির্মাণ করেন না, নতুন ব্যবসার পুঁজি জোগান দেন না। কিন্তু তিনি সেই মানুষটিকে তৈরি করেন, যে একদিন এসব কাজ করবে। এ কারণেই শিক্ষকতা একটি নীরব পেশা হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আজকের শ্রেণিকক্ষের একজন শিক্ষার্থীই আগামী দিনের উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, ব্যাংকার, শিক্ষক, প্রশাসক কিংবা নীতিনির্ধারক। তার চিন্তার ধরন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থানের মধ্যে আজকের শিক্ষার প্রতিফলন থাকবে।
তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সম্মান করা নয়; শিক্ষককে সম্মান করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক শিক্ষককে শুধু শুভেচ্ছা নয়, মর্যাদা দেব; শুধু দায়িত্ব নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দেব; শুধু ফলাফল নয়, তার শ্রম ও সৃজনশীলতাকেও মূল্য দেব। কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু অবকাঠামোতে তৈরি হয় না। তার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক এবং একদল শিক্ষার্থীর সংলাপের মধ্য দিয়ে।
লেখক : ব্যাংকার
গবেষক এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ