প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো যখন এথেন্সের জলপাই বাগানে তার বিখ্যাত 'অ্যাকাডেমি' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল এমন এক প্রতিষ্ঠন তৈরি করা যেখানে কোনো দৃশ্যমান স্বার্থ বা জীবিকার তোয়াক্কা না করে মানুষ সত্য ও দর্শনের মুখোমুখি হবে।
জার্মান শিক্ষাবিদ উইলহেল্ম ফন হুমবোল্ট যখন আধুনিক রিচার্জ সংস্কৃতির বিশ্ববিদ্যালয় মডেল তৈরি করেন, তখন তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ শিক্ষার্থীকে কোনো নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রস্তুত করা নয়, বরং জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে তার আত্মার উন্মেষ ঘটানো।
অথচ আজ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে প্লেটো বা হুমবোল্টের সেই স্বপ্নের করুণ অপমৃত্যু চোখে পড়ে।
যেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাণস্পন্দন হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যা ও মুক্তচিন্তার অবাধ উন্মেষ। তা আজ শুধু সার্টিফিকেট ছাড়া কিছুই প্রদান করে না।
গবেষনার উর্বর ভূমি হওয়ার কথা ছিল পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো; কিন্তু সেখানে দেখা মেলে জীবিকার তাগিদে পরে থাকা কিছু সময়। যে বিদ্যাপীঠের প্রাণস্পন্দন হওয়ার কথা ছিল মুক্তচিন্তার অবাধ উন্মেষ তা আজ দৈন্যে ভারাতুর। তা উদ্ঘাটনে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও পরিসংখ্যান এক করুণ নির্মোহতার দলিল পেশ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি : সন্ধ্যা হতে না হতেই নিভে যায় লাইব্রেরির বাতি। লাইব্রেরির বাতি বন্ধ হলেও জলপাই গাছতলার জম্পেশ আড্ডার কমতি থাকে না। শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রশাসনের সদিচ্ছা নেই। শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো থিংকিং নেই, কোনো প্ল্যানও নেই। সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আধুনিকায়নে নেই কোনো ব্যবস্থা। পরিশেষে অপার সম্ভাবনার স্থান বেকারত্বের আতুলঘড়ে পরিণত হচ্ছে।
বাজেট-সংকোচন : বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক অস্তিত্বের মানদণ্ড নির্ভর করে মৌলিক গবেষণার ব্যাপ্তি ও অর্থায়নে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ৫৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন এবং
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজস্ব বাজেটের নিবিড় ব্যবচ্ছেদ উন্মোচন করে এক অনস্বীকার্য অসারতা। শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বিত বাজেটের সিংহভাগ প্রায় ৬৫% থেকে ৭২% ব্যয়িত হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক অপরিহার্যতায়।
বিপরীতে, জ্ঞান-উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ গবেষণ খাতে বরাদ্দ থাকে সার্বিক বাজেটের মাত্র ১.২% থেকে ২.৪%-এর এক শীর্ণ ভগ্নাংশ।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে।প্রশাসনিক দপ্তরে ভাউচারে ম্যাকানিজমের
মাধ্যমে দুই পয়সা কামানোর সুযোগ থাকলেও গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির পরিকল্পিত ও গঠনমূলক ফান্ডের অচলাবস্থা।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম প্রধান
এলিমেন্ট হলো বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। প্রশাসনিক জটিলতা, নোংরা পলিটিক্স, ক্ষমতার
অপব্যবহার, আবাসন সংকট, পারিপার্শ্বিক ও আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলামের অভাবে আমাদের ক্যাম্পাসগুলোতে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি শতাংশের হিসেবে প্রায় শূন্য।
নিরাপত্তাহীনতা, নানাবিধ সংকট, অপরাধের রিপিটেশন সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সমস্যার বিষয়ে বেস্ট পসিবল ওয়ে বের করার পরিবর্তে যেকোনো সমস্যায় প্রশাসনিক মিথ্যা আশ্বাস অপরাধের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। যা শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে স্তিমিত করে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়