প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
পার্বত্য ও সমতলের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে লালিত আমাদের বাংলাদেশ। এ বৈচিত্র্যময় দেশের অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী গারো সম্প্রদায়। গারো জনগোষ্ঠীর জীবনের সবচেয়ে বড়, জাঁকজমকপূর্ণ এবং আনন্দের সামাজিক-ধর্মীয় উৎসবের নাম 'ওয়ানগালা'। একে সংক্ষেপে 'নবান্ন উৎসব' বা 'ধন্যবাদ জানানোর উৎসব' বলা যেতে পারে। ফসল কাটার পর সৃষ্টিকর্তা বা 'তাতারা রাবুগা' এবং শস্য দেবতা 'মিসি সালজং'-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এ ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
গারো শব্দ 'ওয়ানগালা'র উৎপত্তি 'ওয়ান' এবং 'গালা' থেকে। 'ওয়ান' অর্থ দেব-দেবী বা দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা এবং 'গালা' অর্থ উৎসর্গ করা বা ফেলে দেওয়া। সহজ কথায়, নতুন শস্য ঘরে তোলার পর তা দেবতা সালজংকে উৎসর্গ করার নামই ওয়ানগালা। গারো সমাজের ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুযায়ী, ফসল রোপণ থেকে শুরু করে তা ঘরে তোলা পর্যন্ত সবকিছুর মূল নিয়ন্ত্রক তাদের দেব-দেবী। তাই শস্যদেবতাকে সন্তুষ্ট না করে এবং তাকে নতুন শস্যের প্রসাদ নিবেদন না করে গারোরা নতুন ধান বা কোনো ফসল ভোগ করে না। ওয়ানগালা উৎসবের শুরু নিয়ে গারো সমাজে কিছু লোককথা প্রচলিত রয়েছে। তেমনি একটি লোককথা মতে, পূর্বে পৃথিবীতে ধনসম্পদ, মণি-মাণিক্য, খাদ্যশস্য প্রভৃতির একটি বিরাটকায় বৃক্ষ ছিল। এ বিরাটকায় বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা চারদিক বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একদিন বায়ু দেবতা ঝড় ও শিলাবৃষ্টি দেবতার সাথে এক হয়ে সেই বিরাটকায় বৃক্ষে সজোরে নাড়া দেন। এতে ধান ও ভুট্টা সহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের বীজ মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু বায়ু দেবতা তা সংগ্রহ না করে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। সেই সুযোগে অন্য এক দেবতা বীজগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে মিসি সালজং ধান ও ভুট্টা সহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের বীজ সংগ্রহ করে নিজের ক্ষেতে বপন করেন এবং কালের পরিক্রমায় খাদ্যশস্যের সম্পদশালী হন।
একদিন ভূপৃষ্ঠের সাধারণ মানুষ চিনি গালাপার সাথে শস্য দেবতা মিসি সালজং এর পরিচয় হয়। চিনি গালাপা ধান বা শস্যের ব্যবহার জানতেন না। শুধু বন আলু ও ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করতেন। মিসি সালজং করুণাবিষ্ট ও সহানুভতিশীল হয়ে চিনি গালাপাকে ধানের বীজ উপহার দেন এবং জুম চাষের পরামর্শ দেন। তবে শর্ত থাকে যে প্রতিবছর নতুন ফসল ঘরে তোলার পর প্রথমে মিসি সালজংকে স্মরণ করতে হবে, শ্রদ্ধা জানাতে হবে এবং কৃপাদৃষ্টির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।
চিনি গালাপা জুম চাষে সফল হয়ে শর্তানুযায়ী মংরে পর্বতের চেন্দেন শিখরে নতুন শস্য ও ধূপ নিবেদন করে মিসি সালজং এর উদ্দেশ্যে পূজা/উৎসর্গ করেন। গারো লোককথা মতে এটিই ছিল প্রথম ওয়ানগালা উৎসব। আর এভাবেই বংশপরম্পরায় ও যুগ যুগান্তর ধরে ওয়ানগালা উৎসব গারোদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চলে আসছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গারো জনগোষ্ঠীকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। গারোরা প্রতি বছর সমষ্টিগতভাবে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে। এটাই তাদের বছরের শেষ ও প্রধান উৎসব। উৎসবের সময় সাধারণত পুরো গ্রামজুড়ে আনন্দের হাওয়া বয়ে যায়। প্রথাগতভাবে ওয়ানগালা উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান— যেমন 'রুগালা' এবং 'সাসাৎ সওয়া' (ধূপ নৈবেদ্য)। 'রুগালা'-র দিন ঘরের মধ্যভাগে সাজানো নতুন শস্য ও বাদ্যযন্ত্রগুলোর উপর নতুন চালের গুড়ো ও ধানের এক ধরনের বিশেষ পানীয় ঢেলে মিসি সালজং এর উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ করা হয়। আর 'সাসাৎ সওয়া'-র দিন সালজং দেবতার উদ্দেশ্যে ধূপ বা এক ধরনের সুগন্ধি জ্বালিয়ে ঘরবাড়ি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করা হয়, যা শুভ শক্তির প্রতীক। এ দিনের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো নতুন ধানের চালের গুঁড়ো দিয়ে গৃহ ও মানুষের শরীর রঞ্জিত করা। এ আচারগুলোর নেতৃত্বে থাকেন গারোদের ঐতিহ্যবাহী পুরোহিত বা 'খামাল'। তবে ওয়ানগালাকে পূর্ণতা দেয় এর অপূর্ব সংগীত, নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্র। ঢোলের গম্ভীর আওয়াজ, মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বাঁশির সুর (আদুরি) এবং তরুণ-তরুণীদের হাতের কাঁসার খঞ্জনির তালে তালে পুরো গ্রাম ছন্দময় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গারোদের ঐতিহ্যবাহী 'শতঢোল' বা '১০০ দামার নাচ' ওয়ানগালার সবচেয়ে আকর্ষণীয় রূপ। তরুণ-তরুণীরা তাদের নিজস্ব নকশার রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'দোকমান্দা' ও 'দোকশাড়ি' পরে গোল হয়ে নাচ পরিবেশন করে। এ নাচ ও গান কেবল বিনোদন নয়, এটি তাদের কৃষ্টি, ইতিহাস ও জীবনবোধের এক অমলিন প্রকাশ। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওয়ানগালার রূপ ও উদযাপনের রীতিতেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীনকাল থেকে জুমচাষকে কেন্দ্র করে অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে এ উৎসব উদযাপিত হতো। তবে গারো সম্প্রদায়ের বড় অংশ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বর্তমানে অনেক জায়গায় গির্জা বা খ্রিস্টীয় প্রার্থনা সভার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওয়ানগালার শুভসূচনা করা হয়। তবে তা সত্ত্বেও উৎসবের মূল চেতনা—কৃতজ্ঞতাবোধ, আনন্দ ভাগাভাগি এবং সামাজিক সংহতি— একটুও ম্লান হয়নি। বাংলাদেশে ওয়ানগালা কেবল গারোদের নিজস্ব উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিরও এক অনবদ্য অংশ। শহরের ইট-কাঠের খাঁচা ছেড়ে কিংবা গ্রামীণ জনপদে একত্র হয়ে উদযাপিত এ উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কথা। আধুনিকতার ব্যস্ততম জীবনে প্রকৃতির প্রতি এ কৃতজ্ঞতা জানানোর সংস্কৃতি আমাদের পরম শিক্ষণীয়। ওয়ানগালা আমাদের শেখায় যা কিছু আমরা অর্জন করি, তার পেছনে প্রকৃতির এক বিরাট অবদান রয়েছে। ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে গারো সম্প্রদায় তাদের এ প্রাণের উৎসব বাঁচিয়ে রাখুক এবং এটি আমাদের বহুমাত্রিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করুক—এ কামনা।
লেখক : শিক্ষার্থী, কবি নজরুল সরকারি কলেজ