ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সার আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে

সার আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে

দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি দেশের কৃষি খাতেও প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় তিনটি সার কারখানা আগামী নভেম্বরের মধ্যে চালুর উদ্যোগ এবং আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন সাতটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স ও ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা। এসব কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যমান সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। অথচ প্রয়োজনীয় গ্যাস, কাঁচামাল ও কারিগরি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোতে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, জাতীয় চাহিদার অর্ধেকেরও কম পূরণ হয়েছে রাষ্ট্রীয় উৎপাদন থেকে। টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের অবদান আরও কম। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে শুধু কারখানা চালুর ঘোষণা দিলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। আশুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালুর জন্য ফসফরিক অ্যাসিডসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির মেরামত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও বিসিআইসির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। সার কারখানা চালু রাখার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং কারখানা পরিচালনার ব্যয় বাড়বে। তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জ্বালানির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কারখানা স্থাপনের আগে বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, আমদানির ওপর চাপ হ্রাস এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আমদানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও স্থানীয় উৎপাদন কৃষি খাতকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সারের গুণগত মান, ন্যায্য মূল্য ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ কারখানাগুলো চালুর জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। সার উৎপাদনে স্বনির্ভরতা রাতারাতি অর্জন সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে এ উদ্যোগকে তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত